পীরগঞ্জের কমরেড : মোহাম্মদ হোসেন_ডা. অশোক কুমার ভদ্র

অবিভক্ত বঙ্গভূমিতে রংপুরকে লাল রংপুর নামেই জানতো ভারতবাসীযোগ্য নেতার জন্ম যেমন হয়েছে এই মাটিতে, বিপ্লবী কর্মীও তৈরী হয়েছেনকমিউনিস্ট নেতা মণিকৃষ্ণ সেন রংপুর অঞ্চলের এক কিংবদন্তী নেতাতার সান্নিধ্য এই অঞ্চলে পরীক্ষি, সাচ্চা কমরেড গড়ে উঠেছে অসংখ্যপীরগঞ্জ এলাকায় ছিল অসংখ্য কমরেডতাঁদেরই একজন কমরেড মোহাম্মদ হোসেনপুঁথিগত বিদ্যার বাহার না থাকলেও সেইসব সাচ্চা কমরেডদের জীবন সংগ্রাম বর্তমানে আমাদের প্রজন্মকে লজ্জায় ফেলে

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছিলেন কমরেড মোহাম্মদ হোসেনশৈশবে বেশ ডানপিটে ছিলেনতাঁর জন্মের ছয়মাস পূর্বেই তার পিতৃবিয়োগ ঘটেঅভিভাবকহীন মোহাম্মদ হোসেন লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পাননিবিধবা মা তাঁকে গুর্জিপাড়া প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করে দেননিজ গ্রাম রোজবাহাপুর থেকে বেশ দূরে হওয়া প্রায়ই স্কুলে ফাঁকি দিতেনবন্ধুদের সাথে খেলাধুলা শেষে বাড়ি ফিরতেনউদ্বিগ্ন মা অবশেষে তাকে রায়পুর মাইনর স্কুলে ভর্তি করে দেনসেখানে তিনি ফয়েজ আলী পণ্ডিতের তত্ত্বাবধানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর শিক্ষা পর্বের ইতি টানেন

দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তা ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীতে সিপাহী পদে যোগদেন। হাবিলদার পদে পদোন্নতি পানমায়ের একমাত্র পুত্র সন্তা হওয়ায় এবং বাড়ীতে কোন পুরু অভিভাবক না থাকায় চাকুরিছেড়ে গৃহে ফিরেন

১৯৪৩ সালে পীরগঞ্জ উপজেলার হাকিমপুর গ্রামে ফকির বংশে তিনি বিয়ে করেনশাহ মনির উদ্দিন বিবিজান নেছা দম্পতির কন্যা মরিয়ম নেছা ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ হোসেনের প্রথমা স্ত্রীচার পুত্র দুই কন্যা সন্তান লাভ করেনদুই কন্যার মধ্যে একজন আর বেঁচে নেই। অস্থি টি.বি.তে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৩ সালে মারা যান। পরে পীরগঞ্জ উপজেলার ন্ডিপুর গ্রামে ১৯৬৪ সাল দ্বিতীয়বার বিয়ে করেনএই স্ত্রীর গর্ভে তিন কন্যা সন্তান লাভ করেন১৯৪৯ সালে চাকুরি ছেড়ে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেনকৃষিকাজে মন বসাতে না পেরে বছরেই তিনি আনসার বাহিনীতে যোগদান করেন এবং স্থানীয় আনসার কমান্ডার হিসেবে কাজ করতে থাকেনএক বছর আনসার বাহিনীতে কাজ করার পর বালুয়াহাটে একটি সাইকেলের দোকান শুরম্ন করেনএই সময় কৃষিকাজ সাইকেলের দোকানের উপার্জন দিয়ে সংসার চালানো শুরু করেন

তার এক পুত্র শুধু কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত আছেনবাকি সব ছেলে-মেয়েরাই স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেছেনপ্রচণ্ড অনুরাগ ছিল বলেই সন্তানদের শিক্ষি করে তুলেছিলেনউচ্চ শিক্ষি না হয়েও কমরেড মোহাম্মদ হোসেন শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ কষ্ট বুঝতেনসামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণ চিন্তা করে বাম রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে ছিলেন১৯৪৮ সালের পূর্বে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন নাএক সময় মুসলিমলীগ পাকিস্তা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেনপ্রয়াত কৃষকনেতা কাজী আব্দুল হালিমের সানিধ্যে আসেন এবং তার জীবনে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেকাজী আব্দুল হালিম প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি করতেন

গাইবান্ধা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে মুসলিমলীগ সরকারের গণবিরোধী দক্ষে সমূহের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেনবিশেষ করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কাজী আব্দুল হালিমের সংস্পর্শে এসে কমরেড মোহাম্মদ হোসেন বামপন্থী চেতনার ধারক হনপরে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগে যোগদান করেন একজন কর্মী হিসেবেএই সময়ে তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে সোলায়মান সরকার, আবুল কাশেম মিয়া, মতিউর রহমান, আনিসার রহমান- এর নাম উল্লে করার মতো

রংপুরের কমিউনিস্ট তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তী নেতা মণিকৃষ্ণ সেন-এর সান্নিধ্যে এসে যোগ দেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে১৯৫০ সালে জমিদারী উচ্ছেদ আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট-এর নির্বাচনে আবু হোসেন সরকারের পক্ষে তিনি অক্লান্ত ভাবে কাজ করেননিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে তৎকালীন পার্টির হাতে লেখা মুখপত্র শিখার প্রচার, সরবরাহ পাঠচক্রের অনুষ্ঠানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেনঅসাম্প্রদায়িক মুক্ত চিন্তা ধারক কমরেড মোহাম্মদ হোসেন এর বিচরণ ছিলো সংস্কৃতি অঙ্গনেওএকজন মঞ্চ অভিনেতা হিসেবে পীরগঞ্জ অঞ্চলে ব্যাপক পরিচিতি ছিল তাঁর

নিজ গ্রামে রোজবাহাপু্রসহ প্রতিবেশী মিলনপুর, পচাকান্দর, পীরগঞ্জসহ অনেক গ্রামে বাম রাজনৈতিক দর্শন বিস্তারের জন্য নৈশ বৈঠক করতেনকৃষক সমিতির নেতৃত্বে আসেন পীরগঞ্জ উপজেলায় এবং ধীরে ধীরে রংপুর জেলা কমিটির সদস্যপদ লাভ করেনআজীবন পীরগঞ্জ অঞ্চলের কৃষক স্বার্থরক্ষা সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করেনআইয়ুবী আমলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন১৯৬৪ সালে (কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি) এর পক্ষে নির্বাচনে ভোট সংগ্রহের জন্য কাজ করেনফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালান১৯৬৪-এর সাধারণ নির্বাচনে ন্যাপ প্রার্থী কাজী হালিমের নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন

স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এব সকল আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন১৯৬৮-৬৯ সালের সম্মিলিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনের বেগবান ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন৬৯-এর গণ অভ্যত্থানে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিলসত্তরের সাধারণ নির্বাচন বাঙ্গালি স্বাধিকারের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেনএর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েনমুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিজ পুত্র মোখলেছুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে পাঠানপীরগঞ্জ থানা অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরামর্শদাতাদের অন্যতম ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ োসেননিজ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করেনতাদের নিরাপদ আস্তানাসহ খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেনতার প্রচেষ্টায় ওই অঞ্চলে হানাদার বাহিনী তাদের দোসরদের চলাফেরা বাধাগ্রস্থ হয়দুর্ভেদ্য দুর্গের মত নিরাপদ মুক্ত অঞ্চলের স্বাদ পেয়েছেন স্থানীয় জনগণতার উপস্থিতিতে কোন মুক্তিযোদ্ধার কোন বিপদ হয়নিস্বাধীন বাংলাদেশে তিনি আমরণ কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন৭৫ পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনে স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তির পক্ষে কাজ করে গেছেন

সি.পি.বি অষ্টম জাতীয় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির আমন্ত্রণে ভেটারান হিসেবে উপস্থিত থাকেন

নবম জাতীয় কংগ্রেসে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় কেন্দ্রীয় কমিটি কিন্তু বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননিতথ্যসূত্র : সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য শাহাদৎ হোসেন কমরেড মোহাম্মদ হোসেন-এর জ্যোষ্ঠ পুত্র মু্‌ক্তিোদ্ধা মোখলেসুর রহমান

Nb: (এই লেখাটি এর পূর্বে সাপ্তাহিক একতায় প্রকাশিত হয়েছিল)

লেখক : অবসর প্রাপ্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রাবন্ধিক

 

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.