সত্যেন সেন : মেহনতি মানুষের এক পরম সুহৃদ_গোলাম মোহাম্মদ ইদু

এবং তাঁর প্রতিভা পত্রিকাতে সত্যেন সেনের দিদিদের নিকট লেখা দেয়ার জন্য বলতেন। তাঁর মেজদি ইন্দুবালা ২টি লেখা ভট্টশালী মহাশয়ের পত্রিকার জন্য পাঠিয়েও ছিলেন। সত্যেন সেন তখন ছোট। তাঁর কাকা আচার্য িিতমোহন সেন ছিলেন শান্তিনিকেতনের সংস্কৃত বিভাগের অধ্য। চাকরিসূত্রে তাঁরা সবাই থাকতেন বিক্রমপুরের বাইরে। সত্যেন সেন থেকে যান এখানে। তাঁর অন্তর জড়িয়ে ছিল এদেশের কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের সাথে।

উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রগতিশীল আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব সত্যেন সেন। কৃষক, শ্রমিক, গ্রাম-শহরের মেহনতি মানুষ-এরাই ছিলো তাঁর আন্দোলন ও নানামুখী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের উপজীব্য। অকৃতদার এই পুরুষ কৃষক আন্দোলনের নেতা, শ্রমিকদের সুহৃদ, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ, সাংবাদিক, লেখক, প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের বিশিষ্টজন, গীতিকার, সুরকার, সখের গায়ক, সর্বোপরি দেশের প্রগতিশীল শিল্পীদের সমাবেশ-উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

সত্যেন সেনের স্বপ্ন ছিল একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠন-সে-সমাজে মানুষ প্রকৃত মানুষের মতো বাঁচবে, মানুষের দ্বারা মানুষ শোষিত হবে না, নির্যাতিত হবে না; সমাজে শোষক ও শোষিত থাকবে না, পেশীশক্তির দাপট থাকবে না, গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজের জন্য আপামর মানুষ মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হবে না।
রাজনীতি এবং চাকরির সুবাদে সত্যেন সেনও গ্রামের বাড়িতে তেমন থাকতেন না, কখনো কখনো সময়-সুযোগ পেলে সেখানে যেতেন। জীবনের বেশীর ভাগ সময় তাঁকে জেল থেকে জেলে কাটাতে হতো এবং কৃষক সমিতির কাজে গ্রামে গ্রামে যেতে হতো।
কিশোর বয়সেই সত্যেন সেন দেশ এবং দেশের মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পেয়ে যান। ১৯০০ সালের প্রথম দশকেই বিভিন্ন পত্রিকার সাথে তাঁদের পরিবারের পরিচয় হয়। কয়েকটি পত্রিকার গ্রাহকও হয়েছিলেন তাঁরা।
তাঁদের বাড়ীতে সে সময় একজন লোক ছিলেন। অজানা অচেনা, নাম গোত্রহীন হয়েও লোকটি তাঁদের সংসারের অতি প্রয়োজনীয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তাকে তাঁর ঠাকুরমা কাশী থেকে সোনারংয়ের বাড়ীতে নিয়ে আসেন। ১২ বছর বয়সে তিনি দুর্ভিরে ধকলে সকলকে হারিয়ে শেষে ঠাকুরমার আশ্রয়ে আসেন। নাম মাহাঙ্গু বানিয়া, পিতার নামই শুধু তিনি জানাতেন-রামতনু বানিয়া। বাংলা শিখতে তাঁর অনেক সময় লেগেছিল। সত্যেন সেনের সাথে তাঁর বয়সের তফাৎ ছিল ২৫/৩০ বছরের। তাঁকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন এই মাহাঙ্গু বানিয়া। পরিবারের সবাই তাঁকে বাউ বলে ডাকতেন। নিজের পরিবার পরিজনহীন এই মানুষটি ঘোরতর ব্রিটিশবিরোধী ও স্বদেশীপ্রিয় ছিলেন। সত্যেন সেনের পরিবারের সবাই তাঁকে ঠাকুরমার পালিত পুত্র বলেই জানতো। সংসারের সমস্ত ভারও তাঁর উপরই ছিল। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য একদিনের ঘটনার কথা সত্যেন সেন বলেন, “টঙ্গীবাড়ীর হাটের ধারে কংগ্রেসের সভা ছিল। সভা ভাঙ্গতে রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। সভার শেষে আমরা দু’জন ঘরের দিকে ফিরে চলেছি। দু’জনেই অভিভূত। বক্তার সেই বজ্র আহ্বান তখনো যেন কানের কাছে ধ্বনিত হয়ে চলেছে, ‘দেশের মুক্তির জন্য জীবন দিতে হবে, সর্বস্ব দিতে হবে। দেশকে যারা ভালোবাসেন, শুধু কথায় নয়-দেশকে যারা অন্তর দিয়ে ভালোবাসেন, তাদের আজ সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর ভয়-ভাবনা ছেড়ে দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। স্বাধীনতার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়, আর তারই মধ্যে দিয়ে দেশপ্রেমের অগ্নিপরীা...।’ বক্তার আরও এমন সব কথা, যা শুনলে গায়ের রক্ত নেচে ওঠে আর সারা গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়।” (‘অভিযাত্রী’)।
বাড়ী ফেরার সময় সত্যেন সেনকে বাউ বললেন, ‘শোন, আমার বয়স তো শেষ হয়ে এলো, তুই বড় হবি, তখন তুই কিন্তু দেশের কাজ করবি।’ সত্যেন সেনও করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশপ্রেম ও অসহযোগ আন্দোলনের বীজ বোনার কাজটি সত্যেন সেনের মনে ধরিয়ে দিয়েছিলেন কপর্দকহীন, নিঃস্ব, সর্বত্যাগী এই মাহাঙ্গু বানিয়াই।
সত্যেন সেনের বয়স তখন ১২ বছর। সোনারং স্কুলের ছাত্র। তাঁদের সংসারে তখন স্বচ্ছলতার অভাব দেখা দেয়। তারও সুরাহা করেন বাউ। সত্যেন সেনের কিশোর মনে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, জীবপ্রেম সব কিছুরই উদ্রেক ঘটান এই বাউ। একথা সত্যেন সেন অকপটে স্বীকার করেছেন তাঁর লেখায়। সত্যেন সেন বলেন, ‘তাঁর গল্পের মধ্যে রূপকথা বা বাঘ-ভালুকের গল্প অল্পই ছিল, তাঁর গল্পে ছিল বিস্ময়কর আর রোমাঞ্চকর সব কাহিনী। ছিল ুদিরাম, সত্যেন বসু, প্রফুল্ল চাকী আর কানাইলালের গল্প, ছিল দেশের পরাধীনতা থেকে মুক্তির গল্প, লড়াইয়ের গল্প, বানেশ্বরের বনে বাঘা যতীন, মনোরঞ্জন, যতীশ, নীরেন আর চিত্তপ্রিয়ের রোমাঞ্চকর লড়াই-এর সব কাহিনী।’
সত্যেন সেন এই প্রেরণারই প্রতিফলন দেখেছিলেন জেলের সহবন্দী বন্ধুদের মধ্যে। তাই অংশ গ্রহণ করেছিলেন স্বরাজপ্রাপ্তির আন্দোলনে, যোগ দিয়েছিলেন বিপ্লবী যুগান্তর দলে। বহরমপুর জেলে পাঁচ বছর থাকাকালেই তাঁর বোধোদয় হয় শুধু স্বরাজ নয়, আরো কিছু চাই, যা না হলে শোষণ থেকে দেশের মানুষের মুক্তি নেই। চাই কৃষক-শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি, চাই সমাজতন্ত্র।
আজীবন তিনি এই মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং এরজন্য জীবনপণ করেছিলেন।

দেশবিভাগের পর সত্যেন সেনের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও স্ব স্ব অবস্থানে গ্রামের বাড়ীর বাইরে থেকে যান। দেশে ফেরার তাঁদের অবকাশ হয় নি। ঢাকা জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি জিতেন ঘোষ সাধারণ সম্পাদক জনাব হাতেম আলি খানের সহযোগী হয়ে তাঁর কৃষক ভাই চান মিঞা আর শামসু মিঞাদের মধ্যেই সত্যেন সেন থেকে যান। সোনারং-এ তাঁদের কয়েক বিঘার একটি সম্পত্তি ছিল। জমির উপর তাঁদের বাড়ীঘরও ছিল। সত্যেন সেন কখনো-সখনো সেখানে যেতেন।
এই বাড়ীটি সম্পর্কে প্রতিভাদি (সত্যেন সেনের সেজদি, যাঁর কাছে সত্যেন সেনের শেষ ৮টি বছর কেটেছিল) বলেন, ‘এই বাড়িতে একটা পুকুর ছিল। পুকুরের দণিপাড়ে আমাদের আর উত্তর পাড়ে ঠাকুরদাদের বাড়ি ছিল। বাড়িটার চারপাশে খাল। বর্ষাকালে বাড়িটা দ্বীপের মতো হয়ে যেত।’ সময়ের ব্যবধানে ওই বাড়ির দৃশ্যটি কেমন হতে পারে? নিশ্চয়ই নড়বড়ে জীর্ণ, পড়োপড়ো হবে।
১৯৯৭ সালের ২৮ মে উদীচীর উদ্যোগে সত্যেন সেনের সোনারং-এর বাড়ীতে ‘তীর্থ ভ্রমণের’ উদ্দেশে যাওয়ার একটি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। উপল, সত্যেন সেনের ৯০তম জন্মদিনটি তাঁর বাড়ীতে উদযাপন করা। সোনারং পাইলট হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠান শেষে তাঁর বাড়ীতে সব শিল্পীকর্মী গিয়ে থ’ বনে যান, কোথায় প্রতিভাদি কথিত পুকুর, খালবেষ্টিত বাড়ী! বাড়ির চিহ্নটি পর্যন্ত নেই, বিরাট ভিটির উপর ধান আর পাট তে। আশপাশের বৃদ্ধ ক’জন সত্যেন সেনের নাম এবং তাঁর পারিবারিক নাম-‘লঙ্কর’ নামটি বললেন। জমিজমার কথা কেউ জানেন না। সেখানকার প্রবীণ রাজনৈতিক এক কর্মী জায়গা-জমি সম্পর্কিত কিছু তথ্য দিলেন।
জমির তথাকথিত রাকর্তা জমির-প্রতি নির্লিপ্ত, সম্পত্তির ব্যাপারে নির্মোহ সত্যেন সেনের সমস্ত জমি হজম করে নিয়ে অন্যের নিকট হস্তান্তরের কাজটি বহুদিন আগেই চুকিয়ে দিয়েছেন, সত্যেন সেন তা জানতেও পারেন নি। যখন জানলেন, তখন তাঁর ভাবটি ছিল, এসব দিয়ে আর কি হবে! যে-আন্দোলনের মাধ্যমে ভূমিহীনরা জমি পাবে, সুখে-শান্তিতে বাঁচবে, সে আন্দোলনের পথিক তিনি নিজে। একদিন সবার জমি হবে। তাতেই তাঁর শান্তি। তাঁর নিজের জন্য জমির কি প্রয়োজন? সত্যেনদা’র বাড়ি থেকে ফিরে এসে সেদিন উদীচী সোনারং হাই স্কুল মাঠে সত্যেন সেনের জন্মদিন উদযাপন করে বেশ জাঁকজমকের সাথে। মাঠের প্যান্ডেলের সামনে হাজারো দর্শক-শ্রোতা উপস্থিত হয়। অনুষ্ঠানটি তাদের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়েছিল, আবার কারো চিন্তাচেতনায় ভাবান্তরও ঘটিয়েছিল। মাঠের সভায় বলা হয়েছিল, এ গ্রামে অনুকূল সাড়া পেলে সত্যেন সেনের নামে একটি চু হাসপাতাল খোলা হবে। এতে জমির দখলদারদের জমি খোয়াবার ভয় ছিল বৈকি। উল্লেখ্য, সোনারং হাই স্কুলটি সত্যেন সেনের পিতামহর মামারা স্থাপন করেছিলেন। ওই হাই স্কুলের প্রধান শিক ছিলেন শশীমোহন সেন (১৯০৯), সত্যেন সেনের একজন জ্ঞাতি।
জানা যায় সত্যেন সেনের পিতা ধরণীমোহন সেনের মাতৃকুলের লোকেরা তখনকার দিনে মেয়েদের জন্য বিদ্যাপীঠ স্থাপন করেছিলেন। সে সময়ে মেয়েদের প েশিা গ্রহণ একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিল। সত্যেন সেনের ঠাকুরমাকে তাঁর ভাইদের থেকে লুকিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। সোনারং গ্রামে সত্যেন সেনের পিতামহের মাতৃকুলের লোকেরা বিরাট এক দীঘিও কাটিয়ে ছিলেন গ্রামের লোকদের সুবিধার জন্য। ওই দীঘিতে এক সময় প্রতিমা বিসর্জনও দেয়া হতো। তখন ওই গ্রামে মেলা বসতো। গ্রামে তাদের সময়কার দীঘি ও পাকা দোতলা বাড়ীঘর এখনো দেখা যায়।
সত্যেন সেনের সকল আত্মীয়স্বজনই তাঁদের প্রতিষ্ঠিত সোনারং স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। সোনারংয়ের তাঁদের বাড়ীটির নাম ছিল শান্তি কুটির। নতুন এই বাড়ীটি ১৯০০ সালের দিকে তৈরী হয়। নামটি রেখেছিলেন তাঁর জ্যাঠা মশায়রা।
সত্যেন সেনের ১৩ বছর বয়সে তার পিতা ধরণীমোহন সেন মৃত্যুবরণ করেন। সত্যেন সেনরা তাঁর জ্যাঠা মশায়ের পরিবারে বড় হন। কিশোর বয়স থেকেই সত্যেন সেনের মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি তাঁর দয়া উল্লেখযোগ্য। শুধু বলা নয়, প্রাত্যহিক জীবনে তা বাস্তবায়নে তাঁকে সচেষ্ট হতে দেখা যেতো। কথায় কথায় তাঁর সেজ দিদি প্রতিভা সেন তাঁকে বলেছিলেন, প্রাণী হত্যা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা ও পাপের কাজ। একথাটি তাঁর মনে খুব ধরেছিল। এরপর তাঁরা দু’ভাই মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। একসময়ে গরুর দুধ খাওয়াও ছেড়ে দেয়ার কথা জানালেন সত্যেন সেন; বলেছিলেন গরুর বাচ্চাকে বঞ্চিত করা এ দুধ তিনি খাবেন না। এর ফলে দুর্বল শরীর আরো দুর্বল হতে থাকায় পরিবারের অভিভাবকগণ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর সেই পণ ভেঙ্গেছিল হোস্টেল জীবনে এসে।
সত্যেন সেনের ছোট ঠাকুরদাদা রাজমোহন সেন সংস্কৃতের শিক ছিলেন। ছোট ঠাকুরদাদাকে তাঁর মামারা তাঁদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সোনারং হাইস্কুলের প্রধান করে কুমিল্লা থেকে নিয়ে এসেছিলেন। সত্যেন সেনের আরেক ঠাকুরদাদা প্যারীমোহন সেন ময়মনসিংহে প্রসিদ্ধ কবিরাজ ছিলেন। সেখানকার জমিদার বাড়ীর তিনি নিজস্ব চিকিৎসক ছিলেন। তাঁরই বড়ছেলে অর্থাৎ সত্যেন সেনের কাকা মনমোহন সেন লেখক ও কবি ছিলেন। তাঁর লেখা ‘খোকার দফতর’ ও ‘মোহনভোগ’ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। সত্যেন সেনের আরেক কাকা মুরারীমোহন সেন শিশুসাহিত্যে অনেক সুনাম অর্জন করেছিলেন।
সত্যেন সেনের বড় কাকা অবনীমোহন সেন কুমিল্লায় শিকতা করতেন। সত্যেন সেনের পিতার মাতামহ মহেশ লস্কর (সেনগুপ্ত) ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে সাবজজ ছিলেন। তিনি তাঁর তিন ছেলেকেই তখন ল’ পড়িয়েছিলেন। তাঁর বড় ছেলে রত্নেশ্বর সেন মুন্সিগঞ্জের প্রখ্যাত উকিল ছিলেন।

সত্যেন সেন মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ এক অনন্য মানুষ। যিনি শুধু কলমের মাধ্যমেই সংগ্রাম করেন নি, শোষিত-নির্যাতিত শ্রমিক-কৃষকের বস্তিতে, তাঁদের ঘরে তাঁদের একান্ত আপনজন হয়ে তাঁদেরই মতো দিন-রাত, সপ্তাহ-মাস অতিবাহিত করেছেন। তাদের শত রকমের সমস্যা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছেন, তাদের সুখে-দুঃখে আনন্দ-বেদনায় নিজেকে জড়িয়ে তাদের একান্ত আপনজন হয়ে থেকেছেন। কৃষক-শ্রমিকের বউ-ঝিরা তাঁকে দূরের কেউ বলে ভাবতে পারতো না। তাদের ছেলে-মেয়েরাও নিরহঙ্কার এই লোকটিকে একান্ত আপন করে নিয়েছিল। তাঁর অমায়িকতা, চোখে চোখ রেখে দৃঢ়তার সাথে কথা না-বলা, সকল সময় হাসিমুখ, প্রিতাহীন ধীরস্থির চলাফেরা, যেন বহুদিনের অসুস্থতা থেকে উঠে-আসা কোনো কথক। তাঁকে কখনো হতাশ হতে দেখা যায় নি। কাউকে ভর্ৎসনার জোরালো কোনো কারণ থাকলেও (সংগঠনে) তেমন করে বলতে পারতেন না, যেমন করে বলা উচিত। কোনো একটি বা দুটি কথা বলে বুঝিয়ে দিতেন, বলতেন, এটি ঠিক নয়। এভাবে না, ওভাবে করলে কি ভালো হতো না! তাঁর যতো বলিষ্ঠতা আমরা দেখতে পাবো তাঁর লেখায়, তাঁর সাহিত্যে।
ভাবলে অবাক হতে হয় যে, এই মানুষটি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবী যুগান্তরের কর্মী ছিলেন। বহরমপুর বন্দি-ক্যাম্পে ২৩/২৪ বছর বয়সে তাকে আটক রাখা হয়েছিল ১৯৩০ সালে। ওই বন্দি ক্যাম্প থেকেই তাঁর বই লেখায় হাতে খড়ি, সেটি অনেক পরে চটি বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল, নাম বাদল। বাদল ছিল সিংহলের একজন নায়ক। বহরমপুর বন্দি-ক্যাম্প থেকেই তিনি শোষণহীন সমাজ নির্মাণের সঠিক দিশা-সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। এটিই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের মুখ্য ধ্যান-জ্ঞান। আর তখন থেকেই, শ্রমিক-কৃষকের শোষণমুক্তিই তাঁর ব্রত হয়ে ওঠে। বহরমপুর বন্দি-ক্যাম্প থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রথম জেল জীবন, প্রথম বই-লেখা এবং প্রথম সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর-হওয়া।
প্রথম ফেরারি জীবনে তিনি শান্তিনিকেতনেই লুকিয়ে থাকতেন। সত্যেন সেনের পিতা ধরণীমোহন সেনের মৃত্যুর পর পরিবারের বাকী ক’জন শান্তিনিকেতনে চলে আসেন। অনেক পূর্ব থেকেই সত্যেন সেনের বড় কাকা িিতমোহন সেন শান্তিনিকেতনে আচার্যের দায়িত্বপালন করছিলেন। সত্যেন সেন ব্রিটিশ পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে সেখানে গোপনে বাস করতেন। তাঁর মা মৃণালিনী সেন তখন অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। একদিকে মা’র ভালোবাসার টান, অন্যদিকে শান্তিনিকেতনে শিা পরিবেশের বৈরিতাস্বরূপ সশস্ত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দোসর হয়ে কাজ করা, তাঁর জন্য এক বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। তিনি দিনের বেলা গুরুপল্লীর বাসায় এবং রাতে অন্যকোথায়ও লুকিয়ে থেকে সময় কাটাতে থাকেন। জ্যাঠা মশায় িিতমোহন সেনের শান্তিনিকেতনে বৃত্তি নিয়ে লেখাপড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেই তিনি যুগান্তরে কাজ করেছেন।
১৯৩৩ সালের নভেম্বরে সত্যেন সেনের বড়ভাই জিতেন্দ্র সেন চাকরি আর সত্যেন সেন রাজনীতি নিয়ে কাজ করছেন কলকাতায়। এদিকে তাঁর মা মৃত্যুশয্যায়। জিতেন্দ্র সেনকে টেলিগ্রাম করা হলো সত্যেন সেনকে সঙ্গে নিয়ে আসতে। টেলিগ্রামটি পড়ে যায় পুলিশের হাতে। এবং সত্যেন সেনকে গোপন জায়গা থেকে ধরে জেলে পুরে দেয়া হয়। তাঁর মাকে আর শেষ দেখা হয় নি তাঁর। সে যাত্রায় আলিপুর জেলে কিছুদিন রেখে তাঁকে স্থায়ীভাবে বহরমপুর জেলে বন্দি করে রাখা হয়। প্রায় পাঁচটি বছর তাঁকে সেখানে বিনা বিচারে আটক থাকতে হয়।
বহরমপুর জেল থেকেই তাঁর নিয়মিত লেখার কাজ শুরু হয়। ওই জেলে তিনি এম.এ. পরীাও সমাপ্ত করেন। পাঁচ বছর পর মুক্তি পেয়ে তিনি তখন থেকেই মুক্ত মানুষ, পরিবার নেই, ঘরসংসার নেই, মা-নেই, পিতা তো অনেক আগেই গত হয়েছেন, তাঁর আর পিছু ফিরে দেখার কিছু নেই। তিনি এখন সব বন্ধন মুক্ত, এখন তিনি সবার, তাঁর একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায় মেহনতি মানুষের শোষণমুক্তির সংগ্রাম।
পাকিস্তান হবার আগে থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের মিল অঞ্চলে ঢাকেশ্বরী মিলে তিনি তাঁর অপ্রতিরোধ্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকেন। কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তখন খোলাখুলি কাজ করায় তেমন বাধা ছিল না।
সত্যেন সেনের পরিবারের অনেক সদস্য জ্যাঠা মশায়ের চাকরির সুবাদে বহু পূর্ব থেকেই স্বপরিবারে শান্তিনিকেতনে বাস করছিলেন। তাঁর অন্য ভাই-বোনেরা, কাকা ও কাকার ছেলেমেয়েরা চাকরিসূত্রে তখনকার ভারতের রাজধানীসহ বিভিন্নস্থানে বসবাস করছেন। দেশের বাড়ি সোনারং-এ তাঁদের আর থাকা হয় নি। রয়ে যান শুধু সত্যেন সেন ও মাহাঙ্গু বানিয়া।
সত্যেন সেনের চারজন কাকার মধ্যে পরিবার প্রধান ছিলেন তাঁর জ্যাঠা মশাই আচার্য িিতমোহন সেন। তিনি এই বিরাট পরিবারের মধ্যমণি। তাই তাঁকে ঘিরেই অবস্থান করছিল এই সেন পরিবার। সত্যেন সেনের ভাইবোনেরা সবাই জ্যেঠিমাকেই মা বলে ডাকতেন এবং তাঁর মাকে বড় কাকাত ভাইবোনেরা স্বাভাবিক ভাবে কাকিমা ডাকতেন। সাথে সাথে সত্যেন সেনের ভাইবোনেরাও নিজের মা-কে কাকিমা বলতেন। এ ছিল তাঁদের পারিবারিক সংস্কৃতি। তবু তাঁকে পরিবারের গণ্ডিতে আটকিয়ে রাখার কোনো কর্মই সফল হয় নি। জ্যাঠা িিতমোহন সেনের পরামর্শ তাঁর কোনো কাজে আসে নি। জেল থেকে বেরোনোর পর জ্যাঠা মশাইর পরামর্শে সত্যেন সেন ভাষাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সমস্ত সিদ্ধান্ত দুমড়ে মুচড়ে ফেলে তিনি জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে সমাজতন্ত্র কায়েমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
কবিতা মানুষের চিন্তার দিশা দেয়, সুর তার ভাবনাকে সহজ ও আনন্দময় করে তোলে। গান দিয়ে মানুষের মন জয় করা সহজ। এই সোজা কথাগুলোই সত্যেনদার মনে ধরেছিল বলে মনে হয়। সাহিত্যকর্ম ও সাংবাদিকতার সাথে সাথে তিনি গান নিয়েও কাজ করেছেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বক্তৃতা, জনসভা ইত্যাদিতে নেতারা বক্তব্য দিয়ে সাধারণকে রাজনৈতিক জ্ঞান দান করেন, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের কথা বলেন, কিন্তু শ্রোতাকে তেমন করে কথা শোনার জন্য ধরে রাখতে পারেন না; গান যে বিনোদনের সাধনই শুধু নয়, এই গান দিয়ে মানুষকে রাজনীতিসহ সকল প্রকার শোষণমুক্তির চিন্তায় সচেতন করা যায়, আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা তখনও সেটা তেমন উপলব্ধি করতেন না। সম্ভবত এদেশের রাজনীতিকরা ভারতের, বিশেষ করে কলকাতার পিপলস থিয়েটারের কর্মকাণ্ডের ফলাফলকে নিয়ে খুব একটা ভাবেন নি বলেই অন্যত্র পিপ্‌লস থিয়েটারের মতো সংগঠন গড়ে ওঠে নি।
১৯৪৬ সালের দিকে শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করার সময় ঢাকেশ্বরী মিলে সত্যেন সেন শুধু শ্রমিক কর্মীদের নিয়ে এ ধরনের একটি গানের দল গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। এতে অনেক শ্রমিক-গায়ক জমায়েত হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, নিজেদের দলের প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজয়ী করা। পাকিস্তানি আমলে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি করে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তানী শাসকেরা মতা কুগিত করে মানুষকে তাদের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার স্বার্থে বিভিন্ন অপপ্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করার সুযোগ তৈরী করতো। ’৪৬ সালে কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিকে দমিয়ে রাখতে পারে নি ব্রিটিশ সরকার। তাই তাদের প্রার্থীকে নির্বাচনে জয়ী করার জন্য সত্যেন সেন কবিগানের দল নামে একটি গানের দল গঠন করেছিলেন। শ্রমিকরা নিজেরাই তাঁদের মতো করে গান গেয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তুলতেন। ব্রিটিশ সরকার স্বাভাবিক ভাবেই তাদের জন্য কবর রচনাকারীদের বেশি দিন সহ্য করতে পারে নি। তারই পরিণতিতে আবার সত্যেন সেনকে জেলে নিয়ে শ্রমিকদের শোষণমুক্তির আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে তারা।
দশটি বছর কেটে যায়। এর পরে সত্যেন সেনের বেশীর ভাগ দিন কাটে জেলখানায়। ক’দিন পর পরই তাঁকে জেলে যেতে হতো। তবে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর বেশ কিছুদিন তিনি জেলের বাইরে ছিলেন। গণসংগীত দল গঠন করে সাধারণ মানুষকে গানের মাধ্যমে শোষণমুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণে তাঁর বিলম্ব ঘটে নি।
১৯৫৬ সালের বর্ষাকাল। বিক্রমপুরের ষোলঘর স্কুল মাঠে ঢাকা জেলা কৃষক সমিতির সম্মেলন হবে। সেখানে গানের একটি অনুষ্ঠান করতে হবে। সভায় স্কুলের টেবিল চেয়ার ব্যবহারের জন্য থাকলেও তখন অন্যান্য সরঞ্জাম ঢাকা শহর থেকেই নিয়ে যেতে হতো। কর্মীও। শহর থেকে যাতায়াতের জন্য একমাত্র বাহন ছিল গয়নার-নৌকা। ঢাকা শহর থেকে ষোলঘর পৌঁছতে তখন রাত ফুরিয়ে যেতো (এখন বাসে মাত্র দু’ঘণ্টার ব্যাপার)। এই রাতের সময়টিকে সত্যেনদা কাজে লাগালেন। বড় নৌকা, ভেতরে বহু যাত্রী, তাই নৌকার শক্ত ছাদে (ছই) বসে সারারাত কয়েকটি গান আমরা আয়ত্ত করলাম। ৪/৫টি গানের মধ্যে সত্যেনদার শেখানো গানদু’টিই ছিল সম্মেলনের জন্য মানানসই। অনুষ্ঠানে কোনো হারমোনিয়াম-তবলা ছিল না। খালি গলায় সমবেত কৃষকদের সামনে গানগুলো গাওয়া হয়। সাথে সত্যেনদাও গলা মেলালেন-‘চাষী দে তোর লাল সেলাম/ তোর লাল নিশান রে।’
এ গানটি পরবর্তীতে চাষীদের নিজস্ব সংগীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কৃষক সমিতির যে কোনো সভায় এ গানটি গাওয়া উদীচীর জন্য প্রায় একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল।
সত্যেন সেন রবীন্দ্রসংগীত ভক্ত। তিনি শতাধিক রবীন্দ্রসংগীত জানতেন। আমি তাঁকে রবীন্দ্রসংগীতের সুর ভাঁজতে শুনেছি। একটি স্মৃতি : বরিশালের মনোরমা মাসিমা, সেখানে তাঁর স্কুল রয়েছে মাতৃমন্দির নামে। এর উন্নয়নের জন্য ঢাকার অনেকে অর্থ দান করেছেন। অর্থসংগ্রহ করেছেন সত্যেনদা-ও। উদীচী সে স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করেছে। কমিউনিস্ট নেত্রী মাসিমার স্মৃতিময় এই মাতৃমন্দির বিদ্যালয়ের জন্য আমাদেরও কিছু করার ছিল বলে আমরা ভাবতাম। মাতৃমন্দিরে মাসিমার ডাকে তাই কখনো কখনো যেতে হতো। এখানে একজনের কথা বলতে হয়। তিনি হলেন বোন তরু আহমেদ। তরু বহু আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী এবং সত্যেনদার লেখা ‘মা’ বইয়ের মা’র তিন মেয়ের একজন। প্রয়াত বোন তরুর আরেকটি কাজের স্মৃতি আমাকে বলতে হবে। ’৬৯ সালে দেশে গণআন্দোলনে স্বৈরাচারী পাকিস্তানী পুলিশ মেডিক্যাল হাসপাতালের কাছে ছাত্র মিছিলে গুলি চালায়। গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদ শহীদ হন। তাঁর মৃত্যুতে আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে, প্রেরণা জোগায় আসাদের রক্তমাখা শার্ট। শার্টটিকে পতাকা বানিয়ে উচ্চে তুলে ধরেছিল বোন তরু আহমেদ। মাসিমার আবদারে বরিশালে তরু ও সত্যেনদাকে নিয়ে শুরু করা হয় সারা রাতের ঘরোয়া অনুষ্ঠান। শ্রোতা মাসিমা এবং তাঁর স্কুলের সন্তান-তুল্য শিক-শিকিারা।
গীতবিতানের গানগুলো থেকে দু’লাইন গাইতে হবে। গানের শেষ অর দিয়ে অপর জনকে গাইতে হবে গানের দু’লাইন। আমরা দু’জনে যখনই উদ্দীষ্ট গান গাইতে ব্যর্থ হই তখনই সত্যেনদা গানের লাইনটি ধরিয়ে দিতেন। এভাবে অনেক রাত পর্যন্ত চলেছিল আমাদের অনুষ্ঠান। বোঝা যায় রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে তাঁর জানাশোনাটা কত ব্যাপক ছিল।
১৯৬৫ সালের প্রথম থেকেই কমিউনিস্ট মতবাদের পদ্ধতি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে দেশে দেশে পার্টিগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে দুটি ধারা সৃষ্টি হতে থাকে। এর ঢেউ পূর্ববাংলায়ও প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দেয়। এখানকার পার্টির মধ্যেও আখের-গোছানোর উছিলায় নেতারা তৎপর হয়ে ওঠে। একদল অভিধা পায় চীনপন্থী, অন্যদল মস্কোপন্থী। উভয় দলই দলগতভাবে বেশি সুবিধা পাবার জন্য নির্লজ্জভাবে কর্মীদেরকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করতে ছাড়ে নি। পার্টির অন্তর্ভুক্ত যেসব অঙ্গসংগঠন সক্রিয় ছিল সেগুলোর মধ্যেও ভাঙ্গন ধরে। জীবনপণ করে যারা সমাজতন্ত্র কায়েম করার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করে কর্মযজ্ঞের মাঠে নেমেছিল, সেই ভালো ভালো লোকগুলো নিজের সহকর্মীদেরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দল ভাঙাভাঙি করেছে। কোনো কোনো েত্ের শত্রুতার নজিরও রয়েছে। সত্যেনদা এগুলো সহ্য করতে পারতেন না। আফসোস করতেন : আহা, ভালো ভালো ছেলেগুলো আজ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে! তিনি বেশ মনমরা হয়ে থাকতেন। এভাবে তাঁর বহুদিন কেটে যায়।
শোষণমুক্তির আন্দোলনে সবকিছু ফেলে ঘরসংসার ত্যাগ করে হাতে হাত, বুকে বুক ধরে এগিয়ে যাওয়ার যে ব্রত সহকর্মীরা নিয়েছিল। যার যার মতবাদে চলার পথ তৈরী করার ব্রত কি হালে পানি পেয়েছে? স্বৈরাচারী পাকিস্তানীদের হাতে নিগ্রহ, দীর্ঘ জেলবাস, তাদের অত্যাচার নির্যাতনে জীবন অতিষ্ঠ-করা সময় পার করে দিয়ে যারা বাইরে এসে নিজেদের রাজনৈতিক হানাহানি নিয়ে আনন্দে মশগুল হয়ে পড়েন তাদের কর্মকাণ্ড দেখে সে-সময়ে দুঃখ করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
কৃষক সমিতির কুলাউড়া সম্মেলনে সমিতির দ্বিধাবিভক্ত হবার স্মৃতি আমি এখনো ভুলতে পারি না। সত্যেনদা তখন জেলে। সম্মেলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন প্রবীণ নেতাও ছিলেন। তাঁদেরই একজন অতিতৎপরতার সাথে এবং উৎফুল্ল হয়ে কাউন্সিলারদের বললেন, যাঁরা আমাদের সাথে আছেন, তাঁরা এক দিকে হয়ে যান। তা-ই হলো, একে একে কিছু কর্মী ডান দিকে সরে এলো আর কিছু বামে রয়ে গেল।
এখন হিসাব মিলাতে পারি না শোষণমুক্তির সংগ্রামে দেশের প্রান্তিক মানুষ-কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ-আমাদের কাছ থেকে কি পেলো। আমরাই বা এখন কোথায় আছি! সত্যেন সেন ওই ব্যাপারগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যথিত ছিলেন, হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কাউকে কাউকে দেখা গেছে এ ব্যাপারে মানসিক রোগে ভুগে মৃত্যু বরণ করেছেন। কেউ কেউ সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে অলস জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ কেউ বিপথে হাঁটছেন।

মাঝে মাঝে সত্যেনদা ঢাকার রথখোলার লালচান মুকিম লেনের প্রেস শ্রমিকদের মেসে যেতেন। সেখানে এম এ করিম ও সাইদুল ইসলাম থাকতেন। সাইদুল ইসলামের একটি হারমোনিয়াম ছিল। গানবাজনা হতো। ইউনিয়নের সম্মেলনে সঙ্গীত পরিবেশন করা হতো। মোহাম্মদ তোহার নেতৃত্বে শ্রমিক ফেডারেশন গঠিত হয়। জনসন রোডে এর অফিস হওয়ার পূর্বে প্রেস শ্রমিকদের এই আস্তানাতেই ঢাকা শহরে কমিউনিস্টদের দ্বারা ট্রেড ইউনিয়নের গোড়াপত্তন হয় বলে ধরা যায়। এই মেসের দায়িত্বশীল লোক বলতে ছিলেন ইউনিয়ন নেতা হাবিবুর রহমান। সত্যেন সেন তখন জেলের বাইরে। থাকতেন সূত্রাপুরের রূপচান লেনে। একদিন তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। আমাকে বলা হলো, সত্যেনদা সেরে না-ওঠা পর্যন্ত হাসপাতালে তাঁর পাশে থাকতে হবে। ডাক্তাররা চেষ্টা করছে তাঁর পেট ওয়াশ করতে। প্রথম দিন পুরোপুরি অজ্ঞান ছিলেন, দ্বিতীয় দিন বিপদ কেটে যায়, তৃতীয় দিন অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ’৬৫ সালের কথা।
দু’রাত এম এ করিম ও জি এম ইয়াকুবকেও তাঁর বেডের পাশে বসে থাকতে হয়েছিল। সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর তাঁর বড় দাদা জিতেন্দ্রমোহন সেন এই প্রথম কলকাতা থেকে তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। দাদা ফিরে যাওয়ার পরদিনই সত্যেনদা সন্‌জীদা খাতুনের আজিমপুরের বাসায় যেতে চাইলে তাঁকে সেখানে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই শারীরিকভাবে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর মনমরা ভাব বহুদিন কাটে নি। আজিমপুরের উত্তরের মাঠে বসে তাঁর সাথে অনেক কথা হতো। ইচ্ছা করেই তিনি খুব বেশি ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই তাঁর জীবনসংশয় দেখা দিয়েছিল। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল।
সত্যেন সেনের সাথে সন্‌জীদা খাতুনদের সম্পর্ক অনেক দিনের। সত্যেনদার একটি বই আলবেরুনী। এই বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন ড. কাজী মোতাহের হোসেন। সন্‌জীদা আপার পিতা। সত্যেন সেনের বইগুলো যাঁদের নামে উৎসর্গিত হয়েছে তাঁদের প্রায় সবাই মানুষের মঙ্গলের জন্য কোনো না কোনো ভাবে অবদান রেখেছেন।
ওয়াহিদুল হক ও সন্‌জীদা খাতুনের পরিবারের প্রতি তাঁর ৱেহ অনেক। পাপের
সন্তান বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁদের দু’জনকে। আমাদের এই পৃথিবী উৎসর্গ করেছেন তাঁদের ছোট দুই সন্তান পার্থ তানভীর নভেদ ও রুচিরাকে, এটমের কথা বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁদের বড় মেয়ে অপালার নামে। এথেকে আমিও বাদ যাই নি। তাঁর মনোরমা মাসিমা বইটি আমাকে উৎসর্গ করেছেন।
সত্যেন সেন কেমন, কি ধরনের মানুষ ছিলেন, এ প্রজন্মের তাঁর ভক্তদের মধ্যে অনেকে জানতে চান। ‘তার ভক্ত’ কথাটি যদি তিনি জানতে পারতেন, তাহলে লজ্জায় তাঁর ঘাম ঝরতো বলে আমার মনে হয়। এতো সোজা-সরল মানুষ দেখা যায় না। এ প্রসঙ্গে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে, প্রতিভাদির সত্যেনদার বড় হতে না-চাওয়ার প্রেতিে ছোটবেলাকার তাঁর একটি প্রিয় কবিতার উদ্ধৃতি থেকে। কবিতাটি হলো: ‘হে ভগবান হে ভগবান আমি চাহিনা হইতে/ অনন্ত জলধি লবণাক্ত বারি, নাহিক অবধি,/ কর মোরে ুদ্র, তৃষিত মানবের করিবারে পান।/ হে ভগবান হে ভগবান আমি চাহিনা হইতে/ মহা মহীরুহ দিগন্তব্যাপী,/ করো মোরে ুদ্র বংশদণ্ড খণ্ড করিবারে ত্রাণ।’ তিনি যে এই কবিতার প্রকৃত ভক্ত, বাস্তবিকভাবে তা তিনি প্রমাণ করেছেন। বইলেখার টাকায় আয়-রোজগার তাঁর নেহায়েৎ কম ছিল না। ইচ্ছা করলে অনেক টাকা নাড়াচাড়া করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল ‘নিত্য আনা নিত্য খাওয়া’ একজন সাধারণ মানুষের মতো। একজন কৃষকের মতো। সাদা পায়জামা, সাদা ফুলহাতা শার্ট (বাবুদের পাঞ্জাবি নয়), পায়ে কম দামের স্যান্ডেল, এ ছিল তাঁর পরিধেয়। আর খাবার ছিল তখনকার দিনের এক টাকা, দেড় টাকার খাবার নয়,৬ আনা ছিল তার এক বেলার খাদ্য। ন্বি আয়ের লোকেরাও এর চাইতে বেশি খেতো। অন্যদিকে শরীরের প্রতিও তেমন যত্ন ছিল না তাঁর।
সবার খোঁজ-খবর রাখাটা ছিল তাঁর অভ্যাস। কয়েক দিন কেউ তাঁর নজরের বাইরে থাকলেই তার খোঁজ নিতেন। কারো অসুখ-বিসুখে তিনি দেখতে যেতে না পারলে লোক পাঠিয়ে তার খোঁজ নিতেন।
সবার মাঝে ছোটখাটো হয়ে থাকার জন্যই যেন তাঁর জন্ম। উদীচীর একটি বাড়ির জন্য বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়েও তাঁর ওই দশা। বঙ্গবন্ধু তাঁকে কাছে বসতে ডাকেন, কিন্তু তাঁর পা সরে না। এ এক অদ্ভুত মানুষ ছিলেন সত্যেনদা। কোনো অনুষ্ঠানে পিছনে বসতে পারলেই যেন বেঁচে যান। হাত ধরে নিয়ে তাঁকে সামনে বসানো হতো। এ জন্যই শ্রমিক-কৃষক এবং তাদের প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে অতি সহজ হতে পেরেছেন।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের কিছু শ্রমিক নিয়মিত মাসে মাসে তাঁর সাথে দেখা করতেন। একজন মা-কে আসতে দেখতাম দৈনিক সংবাদ অফিসে। সবাই তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা এবং অভাবী। তিনি নিজেই ছিলেন অসুখকবলিত মানুষ। অথচ অমুকের মা অসুস্থ, তাকে একটা হরলিঙ দেয়া দরকার, তমুকের বোনকে দেখছি না, তার অসুখ, পরীা ফি দেয়া হয় নি, বই কেনার টাকা চাই-ইত্যাকার সমস্যার সমাধান তিনি করে বেড়াতেন। নিজেকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকতেন, এতেই ছিল তাঁর আনন্দ!
সত্যেনদাকে তাঁর দিদি নিজের সংপ্তি জীবনী লিখতে বলায় তিনি সোজাসুজি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তুমি তোমার জীবনী লেখনা না কেন?!’ সত্যেনদা জীবনী লিখতে নারাজ ছিলেন। তাকে নিয়ে হৈচৈ করা তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর লেখা উপন্যাস ভোরের বিহঙ্গীতে ‘কিশোর’ নামে একটি চরিত্র রয়েছে। চরিত্রটি নাকি তিনি নিজেই। এটি পাঠক বুঝে ফেলবে বলে তিনি এই বইয়ের প্রচার চাইতেন না, বইটি বাজার থেকে তুলে নিতেও চাইতেন। বলতেন, এই বই তার অপরিপক্ক হাতের লেখা, এ যে তাঁকে নিয়েই লেখা, অন্যরা তা জেনে যাবে। তাঁর জেলে থাকা অবস্থায় তাঁকে চিঠি লিখতে গিয়ে আত্মীয়দের কেউ কেউ তাঁর নামের পাশে এম. এ. পদবীটা লিখতেন। ১৮.৮.৫২ সালে কুমিল্লা কারাগার থেকে এক চিঠির উত্তরে তিনি লেখেন, ‘আমার নামের পিছে এম. এ.-টা আর দিও না। বড়ই অস্বস্তিকর ও দৃষ্টিকটু মনে হয়।’
সত্যেনদার সাথে আমার পরিচয় ৫০ বছর পূর্বে। আমার বয়স তখন ২০/২১ বছর। ঢাকায় প্রেস ও বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন করি এবং মোহাম্মদ সুলতান ও ইমাদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন যুবলীগে যোগদান করি। একদিন কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী এক বিয়েতে যেতে বললেন। তথাস্তু, তাঁতিবাজারের এক ধনী বসাকের ছেলের বিয়ে। ভদ্রলোক পার্টিসমর্থক। আমন্ত্রিত হলেন জ্ঞান চক্রবর্তী, রণেশ দাশগুপ্ত এবং সত্যেন সেন, সঙ্গে আমি। সত্যেনদাকে সেদিনই আমি প্রথম দেখলাম। চারজন মিলে বিয়ের নিমন্ত্রণ খেয়ে এলাম। সেই দিন থেকেই তাঁর অমায়িক ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। উপরন্তু চারজনই ঢাকার মানুষ। তাঁদের সাথে সখ্যতার এটিই প্রাথমিক কারণ হতে পারে। বেশ কিছু দিন তাঁরা তিনজনই জেলের বাইরে ছিলেন এবং তাঁদের সাথে দেখা সাাৎ হতো। তখন জ্ঞানদা থাকতেন সদরঘাটের মায়া কাটরার তখনকার আওয়ামী লীগ অফিসের কাছে। রণেশদা আর সত্যেনদা সংবাদ-এ বসতেন। বিশেষ করে তাঁদের দু’জনের জন্যই বংশালের সংবাদ অফিস পার্টির লোকদের নিকট সবকিছু জানার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে চুয়ান্ন সালে সত্যেনদা ঢাকায় এসে প্রথমে ওঠেন পার্টি কর্মী ন্যাপ নেতা সরদার আব্দুল হালিমের দণি মৈসুন্ডির বাসায়। তারপর বারবার জেল এবং জামিন-মুক্তির পর বারবারই অস্থায়ী জায়গায় তাঁর বসবাস। জেল-ফেরত লোককে আশ্রয় দেয়া তখনকার পাকিস্তানী আমলে বাড়ি মালিকের জন্য কঠিন কাজ ছিল। সংবাদ-এর কর্ণধার তখন শহীদ শহীদুল্লা কায়সার। তারই প্রশ্রয়ে তাঁরা দু’জন সংবাদ-এ আশ্রয় পান। শহীদ ভাই স্বনামে সংবাদ-এর নির্বাহী সম্পাদক হলেও অলাভজনক গণতান্ত্রিক পত্রিকা এই সংবাদ-এর বেঁচে থাকার সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূল নায়ক তিনিই ছিলেন। শহীদ ভাইয়ের কাছে রণেশদা আর সত্যেনদা খুবই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন।
সংবাদ-এ যোগ দেয়ার আগে কিছুদিনের জন্য সত্যেন সেন তখনকার দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় কাজ করেছেন। পত্রিকাটি তখনকার গণতন্ত্রী দলের ভাবধারায় চলতো। গণতন্ত্রী দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহমুদ আলী, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানপন্থী হয়ে পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য আরেকজন ছিলেন দেওয়ান মাহবুব আলী, তিনি ন্যাপের নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধি হয়ে দিল্লীতে গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, এবং অসুস্থ হয়ে সেখানেই মারা যান। সত্যেনদা পরে সংবাদ-এ আসেন এবং তাঁর চাকরী জীবন শেষ পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে দেন। অসচ্ছল সংবাদ-এর বেতনের তখন কোনো নির্দিষ্টতা ছিল না, যা দেয়া হতো এবং যখন দেয়া হতো তা নিয়েই তাঁরা চলতেন।
সংবাদ-এ বিভিন্ন ধরনের লেখা থাকতো সত্যেন সেনের। তার মধ্যে বিশেষ কলাম ছিল ২/৩টি, সেগুলো তাঁকে নিয়মিত লিখতে হতো। শহরের ইতিকথা এর মধ্যে অন্যতম। মনে পড়ে এই উপ-সম্পাদকীয় লেখার উপাত্ত সংগ্রহের জন্য আমি তাঁর উদ্দিষ্ট জায়গায় তাঁকে নিয়ে যেতাম। খুঁজে-পেতে বার করতাম তাঁর পছন্দের চরিত্র ও উপাদানগুলোকে। ঢাকা শহরের বহু অঞ্চলে বহু লোকের সাথে তাঁর সাাৎকার করিয়ে দিয়েছি। এ ধরনের সাাৎকারের ব্যাপারে আরো অনেকে তাঁকে সাহায্য করতেন। তাঁদের মধ্যে কৃষক নেতা ঢাকা শহরে বসবাসকারী আবুল হাসেম, সত্যেন সেনের কয়েকটি বইয়ের প্রকাশক ‘কালিকলম’-এর আলিম ভাই প্রমুখ ছিলেন। এখানে উল্লেখ করা যায়, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ‘উদীচী’ নামটি সত্যেনদাই দিয়েছিলেন। এবং ‘কালিকলম’ নামটিও তারই দেওয়া।
তাঁর একটি বই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানের ভূমিকার উপাত্ত সংগ্রহের জন্য তাকে পুরান ঢাকার বহু মহল্লায় পড়ে-থাকা অখ্যাত লোকজনের কাছে যেতে হয়েছে। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়, সাইকেলআরোহী পিওন, মহল্লার সরদার, চিরুনির কারিগর, কাউকে তিনি অবহেলা করেন নি, সবার কাছে গিয়েছেন তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সবাইকে নিজের একান্ত বন্ধুর মতো দেখেছেন; খাজা নওয়াবদের কারো কারো সাথেও অকপট ব্যবহার করে, তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তিনি যে একজন কমিউনিস্ট একথাটি সোজাসুজি বলে ফেলতেন। সমস্ত বিদ্বেষ ভুলে তাঁরাও তাঁর অমায়িক ব্যক্তিত্বের কাছে সবাক হয়ে উঠতেন। ঢাকার এক কালের ফুটবলার ও খেলাফত আন্দোলনকারী খাজা সেলিম এবং নবাব আজিমের সঙ্গে তাঁকে আলাপ করতে নিয়ে গেছি। আলাপ শেষে ফেরার আগে তাকে চা পান না করিয়ে ছাড়তেন না। সত্যেনদা নবাবদের ব্রিটিশ-দালালির কথা কোনো অংশেই কম বলেন নি।
সত্যেন সেন কি সাহিত্যিক, নাকি সাংবাদিক, রাজনীতিক, নাকি ঐতিহাসিক, বিজ্ঞান লেখক, উপন্যাসিক, চারণ লেখক, নাকি গীতিকার, নাকি সংগঠক? তাঁকে যদি বলা হতো, আপনি কোনটা? এক কথায় তিনি জবাব দিতেন, ‘আমি কোনোটাই না।’ তাঁর লেখা বই ৪২টি, এর মধ্যে একটি বাজারে আসেনি, তা হলো ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’ (৪র্থ খণ্ড)। তাঁর বই এখন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুন সংস্করণ কিছু কিছু বাজারে দেখা যায়, তা আবার ‘সমগ্র’ আকারে, সবার প েযা ক্রয় করা সম্ভব হয় না।। উদীচী চেষ্টা করেছিল সবগুলো বইয়ের পুনর্মুদ্রণের। কিন্তু বিভিন্ন বাস্তব কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে নি।

ছাপ্পান্ন থেকে ছেষট্টি বাংলার মানুষের সাথে পাকিস্তানশাহীর বিশ্বাসভঙ্গের দশক। বাঙালীর মনেও একটি বিশ্বাস গেঁথে গিয়েছিল যে, এদের সাথে আর না। বাঙালীর জাতিগত অস্তিত্ব বিলুপ্তির চেষ্টার সূচনা অবশ্য ঘটানো হয়েছিল বায়ান্ন সালেই, বাংলা ভাষার ওপর আঘাত করে। অর্থনৈতিক মুক্তি তো দূরের কথা, বাঙালীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে ধর্মের নামে তাকে পাঞ্জাবীর গোলামে পরিণত করার হীন শঠতা চলতে থাকে জোরেশোরে। বাংলাকে তারা তাদের উপনিবেশে পরিণত করার সমস্ত আঁটঘাট বাঁধতে থাকে। বাঙালী নামধারী কিছু বিশ্বাসঘাতককে নিজেদের দালালে পরিণত করে শিল্পে-সাহিত্যে দেশকে পঙ্গু করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল তারা।
এসব ব্যাপারে দেশের মানুষ চুপ মেরে যায় নি। ফাঁক-ফোকর গলে মাথা উঁচু করে এর প্রতিবাদ করেছে। আন্দোলনে নেমেছে সাধ্যমতো। তার নজির ’৬২, ’৬৪, ’৬৮-’৬৯-এর গণআন্দোলন। আন্দোলন কখনো ধিকিধিকি জ্বলেছে, আবার কখনো বিস্ফোরিত হয়েছে। অত্যাচারী পাকিস্তানকে কখনো ছাড় দেওয়া হয় নি। সত্যেন সেন যখন জেলের বাইরে ছিলেন, তখন তিনিও এসব আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দিক থেকে তাঁর মন পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল।
পাকিস্তান সরকারও তখন অনেকটা কাবু, ’৬৫ থেকে ’৬৯ সময়টাতে সত্যেন সেন জেলের বাইরে। ’৬৫ থেকেই ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন ও কৃষক সমিতির কিছু কিছু সক্রিয় কাজ চলতে থাকে দেশে। উদীচীর গঠন কর্মও চলে। এককভাবে বা অস্থায়ী দল গঠন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিছু গান আমরা করতে থাকি। মনে পড়ে ’৬১ তে জেলে থাকার সময়ে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের লেখা কিছু গান আয়ত্ত করি। কবি ও সাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফয়েজ আহমদ ও বিশ্বশান্তি পরিষদের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী আকসাদের সঙ্গে একসাথে বসে এ সমস্ত গান রপ্ত করা হয়। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালও আকসাদ ভাইয়ের নিকট থেকে তুলে নেই। দেশে তখন আমাদের দ্বারাই ইন্টারন্যাশনাল প্রথম গীত, চিত্রায়িত ও বিদেশী টিভিতে প্রদর্শিত হয়। ঢাকা শহর তখন অনেক ছোট। ঢাকার এ অঞ্চলকে এখন পুরান ঢাকা বলা হয়। সেখানেই গানের মহড়া হতো। আজ এ-বাড়ি তো কাল ও-বাড়ি। সত্যেনদা-ও আমাদের সাথে থাকতেন। মহড়ার জায়গার জন্য জায়গা খুঁজতে হতো। বাড়ির মালিক তো সহায়কই, কিন্তু মহল্লার আশপাশের বাড়ির শান্তি ব্যাহত হওয়ার ভয়টা লেগেই থাকতো। এই অবস্থায় সংগঠনের ছাত্র-অংশের আগ্রহে এই গানের দলের নামকরণের কথা ওঠে। সত্যেনদা-ই দলের নামকরণ করেন উদীচী। এই নামের অর্থ না-বুঝেই আমরা সবাই একমত হয়ে যাই। পরে নামের যথার্থ ব্যাখ্যাটি উদীচীর ঘোষণাপত্রে লিপিবদ্ধ করেন রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি বলেছিলেন, আকাশের উত্তরের ধ্রুবতারা দৃশ্যত তেমন স্থান বদলায় না, এ জন্য নাবিক ও পথিক উত্তরের এই তারাকে দেখে তার ল্য ও দিশা ঠিক করে নেয়। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীও মানবমুক্তির পথের সাথী হয়ে তাকে সঠিক পথটি দেখাবে। এ থেকে রণেশদার বিরাট আকাঙার প্রকাশ আমরা ল্য করছি।
আটষট্টি থেকে ঢাকায় বহু সাংস্কৃতিক সংগঠনের আবির্ভাব হয়েছে। সবাই কিছু না কিছু অবদান রেখে অচিরেই বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু সত্যেনদা’র উদীচী কিছু দিনের মধ্যে তার ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করবে। এটা সম্ভব হয়েছে সত্যেনদা’র আদর্শের অনুসারীদের একাগ্রচিত্ততা, অদম্য, নিরলস পরিশ্রম এবং সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ততার জন্য। সত্যেনদা গত হয়েছেন পঁচিশ বছর। আমাদের সাথে সরাসরি কাজ করেছেন মাত্র চার-পাঁচ বছর, কিন্তু প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন এখনো। অনাগত দিনগুলোতে তাঁর প্রেরণায় পথ চলবে উদীচী। আমাদের মাঝে আমরা তাঁকে বেশি দিন পাই নি ঠিকই, কিন্তু আমরা তাঁর স্পর্শ এখনো অনুভব করি।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সত্যেন সেনের ভাগনে হন। তাঁর সাথে তাঁর ঢাকায় আগমণ নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি তাঁর মামা সত্যেন সেন সম্পর্কে আলাপ প্রসঙ্গে বলেন, তাঁর নিজের ব্যক্তিগত কৃতকার্যতার পেছনেও তাঁর মামা সত্যেন সেনের প্রেরণা কাজ করেছে।
পঁয়ষট্টি সালের পর থেকে সত্যেন সেনের শরীর ভালো যাচ্ছিল না, চোখে কম দেখছিলেন, লেখাপড়ায় অসুবিধা হচ্ছিল, উপরন্তু শারীরিক দুর্বলতার জন্য হাঁপানিও বেড়ে যাচ্ছিল। তাঁকে দেখার মতো আপনজন তেমন কেউ ছিল না। মনের জোরও কমে যাচ্ছিল, নতুন কিছু লেখাও বন্ধ হয়ে আসছিল। লেখা বন্ধ হওয়াই ছিল তাঁর জন্য সবচাইতে কষ্টের। কলকাতা যাবার আগে ডিকটেশন দিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছেন। তাতে তাঁর জীবনের ধারাবাহিকতা খুঁজে পেতেন না। দিন দিন তিনি মনমরা হয়ে পড়ছিলেন। চোখের আলো কমে যাওয়ায় তাঁর ভয় যেন বেড়ে গেছে। চিকিৎসা করানো হতো, কিন্তু ফল তেমন মিলতো না। এখানে কে তাকে দেখবে? সত্তর সালে চোখের চিকিৎসার জন্য মস্কো পাঠানো হলো। ফিরে এলেন, কিন্তু চোখের অবস্থা তেমন ভালো হলো না। চলাফেরা করছিলেন, কিন্তু তাঁর আসল কাজ লেখালেখি তেমন হচ্ছিল না।
দাম্ভিক হঠকারী পাকিস্তানশাহী জল্লাদ ইয়াহিয়ার অত্যাচার যখন সমস্ত মাত্রা ছাড়িয়ে বাঙালীর জন্য তার নিজস্ব দেশকে দোজখে পরিণত করলো, বর্বর নির্যাতনের শুরুতে ঢাকাবাসী যখন দিশাহারা হয়ে শহর ছাড়ছিল, সত্যেনদা সেদিনও শহর ছাড়েন নি, পরিচিত জনদের খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। এপ্রিলের প্রথম দিকে আমার খোঁজে ঢাকার বিশ মাইল দূরের শ্রীনগরে এসে আগরতলা যাবার পথে আমার সাথে দেখা করে কয়েকজনের খোঁজ নিতে বললেন। কয়েকজনের জন্য খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং তাদের খবর নিতে বললেন।
ভগ্নস্বাস্থ্য ও প্রায়-অন্ধত্ব তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। শেষে আশ্রয় নিলেন তাঁর সেজদি প্রতিভা সেনের কাছে, শান্তিনিকেতনে। তাঁর স্বাস্থ্যের দিকে চেয়ে আমরাও তাঁর চলে যাবার কথা বলে আসছিলাম। আমি তাকে বলেছিলাম, ‘এখানে অসুস্থতার জন্য কিছুই লিখতে পারেন না, ওখানে গেলে আপনি ভালো হয়ে যাবেন এবং কাজও করতে পারবেন, তাতে আরো কিছু লেখা আপনার থেকে আমরা পাবো।’ ১৯৭৩-এর পর শেষবারের মতো তিনি শান্তিনিকেতনে সেজদির কাছে চলে যান। চিঠিপত্রে তাঁর সাথে যোগাযোগ হতো। তিনি দিল্লি-কলকাতা ঘুরে ঘুরে আত্মীয়দের সঙ্গে কিছু দিন কাটান। শেষে প্রায় অচল অবস্থায় দিদির কাছে এসে থাকেন। তাঁর সাথে দেখা করার জন্য আমাকে তিনি লিখতেন! উদীচীর কথা, সংবাদ-এর কথা, দেশের কথা জানতে চাইতেন। আমাকে তখন পাসপোর্ট দেয়া হতো না, শত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাই সত্যেনদা’র সাথে আমি দেখা করতে পারি নি। ১৯৮১-তে তিনি মারা গেলেন। তাঁর সাথে আমার আর দেখা হলো না। ১৯৮৩-তে শান্তিনিকেতনে গিয়ে সেজদির সাথে দেখা করেছিলাম। যে-ঘরে সত্যেনদা থেকেছেন, সে-ঘরে আমি দু’দিন থেকেও এসেছি।
এক সময় সত্যেনদার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। হাঁপানি রোগ প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছিল। আমরা তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সেবা দিয়ে, যত্ন দিয়ে এখানে রেখে দিতে পারি নি। এ আমাদের ব্যর্থতা। আমরা এক সময় কমরেডদের জন্য কমিউন পরিচালনা করতে পেরেছিলাম মাথায় সমস্ত ভয় ও ঝুঁকি নিয়ে; কিন্তু সত্যেন সেন, রণেশ দা’দের রেখে দিতে পারি নি ঢাকায়। তাঁদের অন্তিম সময়টা কেটেছে অন্যত্র।
মাহাঙ্গু বানিয়ারও ওই দশা ঘটতে পারতো, তাঁকে রা করেছেন স্বয়ং সত্যেন সেন। ১৯৫৪তে তৃতীয়বারের মত জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন সত্যেন দা। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৪, পাঁচ বছর পর। জেলে থাকা অবস্থায় দেশে সব ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটে গেছে। পঞ্চাশের একতরফা দাঙ্গায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষ নিজেদের সহায় সম্পত্তি, ঘরবাড়ী, তে-খামারের মায়া ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, জীবন বাঁচিয়েছেন। অন্যদিকে মোটামুটি সম্পদশালী হিন্দুরা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল গরিব হিন্দুদের বাঁচার কোনো পথ ছিল না। তাদের না ছিল বাড়িঘর, না ছিল অর্থের সংস্থান। তাঁরা তখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন। এ ধরনের একটি ধোপা পরিবারকে রার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মাহাঙ্গু বানিয়া।
জেল থেকে বের হয়ে সোনারংয়ের নিজ বাড়ীতে এসে সত্যেন সেন দেখতে পান “ঘর নাই, বাড়ী নাই, গাছপালা নাই-কি এক মর্মান্তিক দৃশ্য!” “আমার গ্রামকে আমি চিনতে পারছি না,” সত্যেন দার মন্তব্য। অনেক আগে থেকেই দেশের বাড়িতে সত্যেন সেন ও মাহাঙ্গু বানিয়া ছাড়া কেউ থাকতেন না। ভাইরা মাহাঙ্গুর জন্য কিছু টাকা পাঠাতেন, আর তাই দিয়ে তিনি ওই ধোপা পরিবারটিকে নিয়ে চলতেন। জেলের বাইরে থাকলে সত্যেন সেন বাড়িতে আসতেন এবং কৃষক সমিতির কাজ পরিচালনা করতেন। তাঁর বাউ (মাহাঙ্গু বানিয়া) তখন চোখে তেমন দেখতে পান না, বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। শরীর চলে না। এখানে আর কিছুদিন এভাবে থাকলে তার জীবন বিপন্ন হবে। শান্তিনিকেতন থেকে বারে বারে চিঠি আসে সেখানে চলে যাবার জন্য। তখন টাকা পাঠানোও রাষ্ট্রীয় কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাঁকে শান্তিনিকেতনে মা’র নিকট পাঠিয়ে দেয়া শ্রেয় মনে করেন সত্যেন সেন। অনেক ভেবে চিন্তে শেষে তাঁর কমরেড ইন-আর্মস বাউকে সেখানে রেখে তিনি ফিরে এলেন।

প্রথম দিকে সত্যেন সেন কবিতাও লিখতেন। তাঁর সেজদি জানান, লঙ্কর (সত্যের সেন) এক সময় কবিতা লেখা শুরু করে। তার দু-একটি কবিতা নবশক্তিতে দেখেছিলাম। ৫০-এর দশকে তিনি কিছু গান লিখেছিলেন। গানগুলি তখনকার কৃষক সমিতির অনেক কাজে লেগেছিল। কৃষক সমিতির কর্মীরা তখন এ গানগুলি বিভিন্ন সভা সমিতিতে পরিবেশন করতেন।
তখনকার কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কৃষকনেতা হাতেম আলি খানের সম্পাদনায় চাষির গান নামে গানের সংকলন একটি চটি বই বের করা হয়। তাতে বিভিন্ন জনের কিছু গান রয়েছে। এ বইতে সত্যেন সেন রচিত বেশ কটি গানও আছে। গানগুলি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে থাকে। এ পর্যন্ত সত্যেন সেনের ১১টি গান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কতগুলি গানে সত্যেন সেন নিজেই সুরারোপ করেছেন। কিছু গানে প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমান ও কিছুগানে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অজিত রায় সুর সংযোজন করেছেন। এখানে কয়েকটি গানের লাইন সংপ্তিাকারে তুলে ধরা হলো :
ক. মাঝ নদীতে ভরা নাও কতই হলো তল,
সামনে পিছে নাচে মুখর কুটিল কালো জল
ওহ হুঁশিয়ার পাককা মাঝি
মজুর আর কিষাণ ॥
খ. ভাইরে বুঝ কি আর মলে!
দিনে দিনে সব খোয়াইলি এমনি কপাল পোড়া
ও তোর রক্ত শুষে হচ্ছে মোটা টাকার কুমির যত
পরের ধনে পোদ্দারেরা মারছে তোরে ছলে বলে।
বুঝ কি আর ম’লে।
তাঁর একটি গান কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের আদলে লেখা, কাজি নজরুল ইসলাম যেমন লিখেছিলেন-‘জাগো অনশন বন্দী ওঠো রে যত’ সেই ভাবধারায় লিখিত।
সত্যেন সেনের আরেকটি গান কৃষক সমিতির চাষির গান বইটিতে স্থান পায় নি, চাষির গান বইটি বের হওয়ার পর তা রচনা করা হয়েছিল। গানটি সম্ভবত পঁয়ষট্টি সালের প্রথম দিকে লেখা। গানটি হলো-
ও আমার দেশের ভাই দেশের ভাই
দেশের ভাই
আমার মিনতি শোনো শোনো।
শোনোরে ভাই দেশের মানুষ
মুখ তুলিয়া চাও
ঘরের ইন্দুর বাঁধ কাটে ভাই
দেখতে কিনা পাও,
দিনের দিন হইলাম ীণ
কাল থাকিতে বিহিত কর নইলে উপায় নাই।
১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি সত্যেন সেন শান্তিনিকেতনে তাঁর দিদির বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ছিপছিপে পাতলা গড়নের মানুষ নাকি সাধারণত সুস্থ থাকে এবং অনেক আয়ু ধারণ করে। কিন্তু সত্যেনদা’র ব্যাপারে উল্টোটা দেখি। মনে হয়, ’৬০-এর পরেই তিনি স্বাস্থ্যগত দিক থেকে ভেঙে পড়েছিলেন। সত্যেন সেনের জেল জীবন প্রায় আঠার বছরের। জেলে দীর্ঘ বন্দীজীবনে তাঁর শারীরিক ও মানসিক তি শেষ জীবনে তাঁকে কাহিল করে দিয়েছিল।
রণেশ দাশগুপ্ত ও সত্যেন সেন দু’জন ছিলেন মানিকজোড়। বয়সে সত্যেন দা বড়, কিন্তু রণেশদার খবরদারি তিনি মাথা পেতে নিতেন। শরীর, খাওয়া-দাওয়াসহ সব ব্যাপারে রণেশদা’র সাথে তিনি পরামর্শ করতেন। কলকাতায় শেষ জীবনে, অন্তিমকালে দু’জনের একই পরিণতি ঘটতে যাচ্ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী সরকারের আনুকূল্যে রণেশদার লাশটি উদীচীর উদ্যোগে দেশে এনে সৎকার করা গেছে। তিনি অনাগরিক হয়ে সেখানে সৎকারে যাচ্ছিলেন। উদীচী সভাপতি হাসান ইমাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারে রণেশদার বন্ধুদের সহায়তায় তাঁর লাশ ঢাকা নিয়ে আসেন। আর সত্যেন দা? তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সবার সাথে আগরতলা হয়ে কলকাতা যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। চোখ এবং হাঁপানির জন্য তাঁকে একাত্তরের শেষের দিকে মস্কোতে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়। বাহাত্তরের প্রথম দিকে তিনি দেশে ফিরে আসেন। শরীর খুব বেশি খারাপ হয়ে গেলে তিনি শেষ বারের মতো তেয়াত্তরে চিকিৎসার জন্য কলকাতা গিয়ে আর ফিরে আসেন নি। মৃত্যুপর্যন্ত শান্তিনিকেতনেই ছিলেন। শেষ ছয়টি বছর দিদির কাছে থেকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এদিকে তাঁর ভারতীয় ভিসা এমনকি পাসপোর্টের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই। এ বিষয়ে তাঁর কোনো খেয়াল ছিল না। আইনত তিনি হয়ে পড়েন অনাগরিক। তাঁর মৃত্যুর পরপরই স্থানীয় গোয়েন্দারা নড়েচড়ে উঠেছিল। নাগরিকত্বহীন মানুষটিকে নিয়ে কানাঘুষা চলছিল। মৃত্যুর খবরটি তখন কলকাতায় চলে এসেছিল। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী সরকারের তখনকার সেচমন্ত্রী সত্যেন সেনের পরিচিত কানাইবাবু তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানতে পেরে রণেশ দাশগুপ্ত ও ঢাকার কমিউনিস্ট নেতা কলকাতায় অবস্থানকারী ওহিদুল হায়দার চৌধুরীকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নিকট গিয়ে বিস্তারিত জানালেন। জ্যোতি বাবু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সমস্ত কাগজপত্র ঠিক করে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন এবং শান্তিনিকেতনে খবর পাঠালেন। এরপরে স্ব-সম্মানে সত্যেন সেনের লাশের সৎকারে হলো এবং নাগরিকত্বহীনতা থেকে তিনি মুক্ত হলেন। রণেশদা এবং সত্যেনদা দুজনই জ্যোতি বসুর পূর্বপরিচিত ছিলেন।
সত্যেন সেন দেশে অনেকের কাছে অনবরত চিঠি লিখতেন, দেশের খবর, দেশের মানুষের খবর, রাজনীতির খবর, উদীচীর খবর, সংবাদ-এর খবর জানতে চাইতেন। দেশে ফিরে না-আসতে পারায় তাঁর আপে আমাদের ব্যাকুল করে তুলতো, কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। শেষে তিনিও বুঝে নিয়েছিলেন যে, তাঁর আর দেশে ফেরা হবে না। দেশে এলে নাকি কাজের চাইতে তাঁর দ্বারা অকাজই হতো বেশী। আমাদের কাছে তিনি নাকি দুর্বহ হয়ে থাকতেন। হতেও পারে! এখানে সবাই তো তাঁর সেজদি নন!
আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়াকে তিনি তাঁর দুর্ভাগ্য বলেছেন, আবার বলেছেন, তাঁর অবর্তমানে আমাদের কাজের শক্তি নাকি বেড়েও গেছে। মানুষের জন্য যারা সবকিছু উজাড় করে দিয়ে যায়, তাঁরাই এমন কথা বলতে পারেন। মানুষ তাঁদেরকে কখনো ভুলে না।
তাঁর প্রকাশিত রচনা
১. আলবেরুনী; ২. ভোরের বিহঙ্গী; ৩. জীববিজ্ঞানের নানা কথা; ৪. সেয়ানা; ৫. গ্রাম বাংলার পথে পথে; ৬. ইতিহাস ও বিজ্ঞান (১ম খণ্ড); ৭. ইতিহাস ও বিজ্ঞান (২য় খণ্ড); ৮. বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম; ৯. সীমান্ত সূর্য গাফফার খান; ১০. অপরাজেয়; ১১. কুমারজীব; ১২. মানব সভ্যতার ঊষালগ্নে; ১৩. বিদ্রোহী কৈবর্ত; ১৪. মনোরমা মাসীমা; ১৫. পাপের সন্তান; ১৬. বিপ্লবী রহমান মাষ্টার; ১৭. শহরের ইতিকথা; ১৮. উত্তরণ; ১৯. পাতাবাহার; ২০. মসলার যুদ্ধ; ২১. মহাবিদ্রোহের কাহিনী; ২২. অভিশপ্ত নগরী; ২৩. প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ; ২৪. পুরুষমেধ; ২৫. সাত নম্বর ওয়ার্ড; ২৬. রুদ্ধ দ্বার মুক্ত প্রাণ; ২৭. মা; ২৮. একূল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে; ২৯. পদচিহ্ন; ৩০.অভিযাত্রী; ৩১. এটমের কথা; ৩২. আমাদের এই পৃথিবী; ৩৩. মেহনতি মানুষ; ৩৪. আইসোটোপ; ৩৫. বিকিরণ; ৩৬. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা; ৩৭. প্রাচীন চীন; ৩৮. প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ; ৩৯. ইতিহাস ও বিজ্ঞান (৩য় খণ্ড); ৪০. বিশ্বমানবের মহাতীর্থে; ৪১. কমরেড মনি সিং; ৪২. ইতিহাস ও বিজ্ঞান (৪র্থ খণ্ড), এই বইটি আর আলোর মুখ দেখতে পায় নি।
পদক
সত্যেন সেন তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তিনটি পুরস্কার পান। প্রথম পুরস্কারটি ছিল ১৯৬৯ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, দ্বিতীয়টি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর সাহিত্যপুরস্কার এবং তৃতীয়টি হচ্ছে ১৯৮৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক।
চিঠি
প্রায়-অন্ধত্ব ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে শান্তিনিকেতনে তাঁর সেজদির আশ্রয় নেয়ার পর দেশের জন্য, তাঁর সহকর্মীদের জন্য তাঁর মন কাঁদছিল, তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। ঘনঘন সবার নিকট চিঠি লিখতে থাকেন। তাঁর লেখা একটি চিঠি এখানে উদ্ধৃত করা হলো।
৭ রাকাতগঞ্জ
নতুন দিল্লী-১
২০-১১-৭৩
প্রিয় ইদু ভাই
এতদিন চুপ করে ছিলাম। কিছুদিন ধরে ঢাকায় অনেকের কাছেই চিঠি লিখে চলেছি। সকল চিঠির একই মর্ম-আমার আর বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া হবে না। গত দু’বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবং সমস্ত দিক বিবেচনা করে আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমি এ নিয়ে অনেক ভেবে দেখেছি। আমার শরীর ও মনের যা অবস্থা দাঁড়িয়েছিল তাতে আমি এখানে কোনো কাজই করতে পারছিলাম না। উল্টোপাল্টা চিন্তার ফলে কাজের পরিবর্তে অকাজই করে চলেছিলাম। তার ওপর নানা দিক দিয়ে আপনাদের উপর দুর্বহ যাতনার মত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আপনারা বুঝতে পেরেছিলেন কি-না জানি না, যাকে বলে প্রকৃতিস্থ আমি তা ছিলাম না। এভাবে পড়ে থেকে কোন লাভই হ’ত না। পরপর দু’বারের অভিজ্ঞতার পর এই সত্যটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই জন্যই অনেক দুঃখে আমার সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে হয়েছে।
এখানকার শান্ত পরিবেশ, চিকিৎসা ও সেবাযত্নের ফলে আমি আবার ভাল হয়ে উঠেছি। জানি না এই ভালটা কতদিনের জন্য। এখানে আর আমি কি কোনো কাজে লাগতে পারব? সে আশা খুব কম, তবু চেষ্টা করে দেখব।
আপনি আর আমি দু’জনে মিলে একদিন উদীচী-কে গড়ে তুলবার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম, আজ তা কিছুটা রূপ নিতে চলেছে। কিন্তু যে সর্বাঙ্গীন সংকট আজ বাংলাদেশকে ঘিরে ধরেছে, তার মধ্যে দিয়ে কি করে এগোতে হবে, উদীচী-কে আজ এই কঠিন প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। ঠিক এই সময় আমাকে আপনাদের (কাছ) ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। অবশ্য, এটাও দেখা গেছে আমার অবর্তমানে উদীচীর কাজের শক্তি যেন বেড়ে যায়। তা হলেও আপনাদের সবাইকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে আসা, এটা আমার নিজের প অতে্যন্ত দুর্ভাগ্যের কথা। এমন ভালোবাসা আমি কোথায় পাব!
চলে আসার আগে আপনার সঙ্গে শেষ কথাটা কি হয়েছিল মনে আছে? সংবাদ অফিস থেকে ফোনে বলেছিলেন, ‘কি দাদা, ভাগা দিবার মতলবে আছেন নাকি?’ যথার্থ কথাটাই বলেছিলেন। আমার হয়তো আর ফেরা হবে না, এই কথাটা মেনে নিয়েই আমি আপনাদের কাছ থেকে মনে মনে বিদায় নিয়েছিলাম। সেই চিন্তাটাই আজ সত্যে পরিণত হয়েছে। এজন্য আপনারা রাগ করবেন আমার উপর?
এদেশে আমার কোনো স্থায়ী আস্তানা নাই। যাযাবরের মতো নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে থাকব। কি করব না করব, সবকিছুই অনিশ্চিতের হাতে, তবে যেখানেই থাকি না কেন, দিল্লীর ঠিকানায় চিঠি লিখলে আমি পাব। আমার ভাই বোনদের সবাইকে আমার ভালবাসা জানাবেন। আপনিও আমার ভালবাসা জানবেন।
সত্যেন সেন

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.