ভারতীয় উপমহাদেশ
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করার জন্য যে সকল মহান ব্যক্তি, লড়াকু যোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করেছেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অহিংসায় নয়, উদারতায় নয়, শক্তি প্রয়োগ করেই ব্রিটিশকে ভারত থেকে তাড়াতে হবে- এই মন্ত্রকে ধারণ করে আমৃত্যু লড়াই-সংগ্রাম চালিয়েছেন।
সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের সংগঠক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যে কারণে বিপ্লবী যোদ্ধারা তাঁকে নেতাজী বলে সম্বোধন করতেন। ভারতের যুব সম্প্রদায়কে নেতাজী বলেছিলেন "তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব"। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনেরও অন্যতম নেতা।
তিনি পরপর দুবার ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধির সাথে রাজনৈতি মতাদর্শগত মতভেদের কারণে কংগ্রেসের অনাস্থার ফলে এই পদ থেকে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। নেতাজী বিশ্বাস করতেন, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি স্বাধীনতা আদায়ে যথেষ্ট নয়। তাই তিনি সশস্ত্র বিপ্লববাদী প্রতিরোধের পক্ষ নিয়েছিলেন।
তিনি অল-ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক নামে পৃথক একটি রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। জাপান-অধিকৃত সিঙ্গাপুরে রাশবিহারী বসুর তত্ত্বাবধানে ভারতীয় উপমহাদেশের যুদ্ধবন্দীদের নি্যে গঠন করেন আজাদ-হিন্দু ফৌজ। এই ফৌজ নিয়ে তিনি উত্তরপূর্ব ভারতীয় সীমায় প্রবেশ করে ইম্ফল অবধি দখল করতে সক্ষম হন। ব্রিটিশরা তাঁকে ১১ বার জেলে পাঠিয়েছিল।
১৮৯৭ সালে ২৩ জনুয়ারী উড়িষার কটক শহরে এক বাঙালি পরিবারে নেতাজির জন্ম হয়। তাঁর বাবা জানকিনাথ বসু একজন বিখ্যাত আইনজীবি ছিলেন। তাঁর ছাত্রজীবন শুরু হয় কটকের রভিন সাও কলেজিয়েট স্কুলে। কলকাতার স্কটিস চার্চ কলেজ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।এরপর তিনি কেমব্রিজ ইউনিভারসিটির ফিটজউইলিয়াম কলেজ পড়াশোনা করেন। ১৯২০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস এ-পরীক্ষা দেন এবং চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস থেকে পদত্যাগ করে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান দেন।
ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতাজী স্বাধীনতা সংগ্রামী চিত্তরঞ্জন দাসের সাথে কাজ করা শুরু করেন। ১৯২৪ সালে এপ্রিল মাসে কলকাতা কর্পোরেশনের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার হিসাবে নিযুক্ত হন।
চিত্তরঞ্জন দাস তখন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন। যদিও সুভাষ চন্দ্রের বেতন ছিল মাসে ৩০০০ টাকা, তিনি সিদ্ধান্ত নেন মাসে ১৫০০ টাকা বেতন নেওয়ার। ওই বছর অক্টোবর মাসে নেতাজীকে সরকার বিরোধী কাজ করার জন্য গ্রেফতার করে কলকাতার আলিপুর জেলে রাখা হয়।
১৯৩০ সালে ২৩ জানুয়ারি তিনি ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে এক পদযাত্রায় প্রধান ভূমিকা পালন করার জন্য তাকে আবার আটক করা হয়। ওই বছর জেল থেকে বেরিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি কলকাতার মেয়র হিসাবে নিযুক্ত হন।
বিপ্লববাদী শসস্ত্র আন্দোলনের জন্য ব্রিটিশ সরকার নেতাজীকে তার বাড়িতেই নজর বন্দি করে রাখে। ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে ইউরোপে চলে জান। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি ইউরোপের বহু রাজনৈতিক নেতা ও মহান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন। কারণ তিনি উপলব্দি করতেন, ভারতমাতাকে ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে স্বাধীন করতে হলে বাইরের দেশের সেনা ও রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা দরকার হবে।
১৯৩৭ সালে সুভাষ চন্দ্র বোস তাঁর ব্যক্তিগত সচিব এমিলিকে সহধর্মীনী করেন। ১৯৪২ সালে তাদের কন্যা সন্তান অনিতার জন্ম হয়।
দিত্বীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুভাষ চন্দ্র বোস প্রস্তাব করলেন, কবে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের স্বাধীনিতার অনুমোদন দেবে তার জন্য বসে না থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সুবিধা নেওয়া উচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নির্ভর করে অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কুটনৈতিক সমর্থনের উপর। তাই তিনি ভারতের জন্য একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী মূলত গড়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী নেতা রাস বিহারি বসুর হাতে। ১৯৪৩ সালে রাস বিহারি বসু এই সেনাবাহিনীর দ্বায়িত্ব সুভাষ বোসের কাছে হস্তান্তর করেন। একটি আলাদা নারী বাহিনীসহ এতে প্রায় ৮৫,০০০ হাজার সৈন্য ছিল। এই বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল প্রাদেশিক সরকারের হাতে। যার নাম দেওয়া হয় "মুক্ত ভারতের প্রাদেশিক সরকার"। এই সরকারের নিজস্ব মুদ্রা, আদালত ও আইন ছিল। অক্ষ শক্তির ৯ টি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দান করে। আই.এন.এর সৈন্যরা জাপানিজদের আরাকান ও মেইক্টিলার যুদ্ধে সাহায্য করে।
সুভাষ চন্দ্র বোস আশা করেছিলেন, ব্রিটিশদের উপর আই.এন.এর হামলার খবর শুনে বিপুল সংখ্যাক সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে হতাশ হয়ে আই.এন.এতে যোগ দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হল না। বরং যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে জাপান তার সৈন্যদের আই.এন.এ থেকে সরিয়ে নিতে থাকে। এবং জাপান থেকে অর্থের সরবরাহ কমে যায়। অবশেষে, জাপানের আত্মসমর্পন এর সাথে সাথে আই.এন.এ ও আত্মসমর্পন করে।
ধারণা করা হয়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস ১৯৪৫ সালের ১৯ আগষ্ট টোকিও যাবার পথে, তাইওয়ানে এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। তবে তার মৃত্যুর সঠিক তারিখ ও স্থান সম্পর্কে এখনো বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। তাঁর দেহাবশেষ কোনোদিনও উদ্ধার করা যায়নি।

আরও পড়ুন
-
সত্যেন সেন : মেহনতি মানুষের এক পরম সুহৃদ_গোলাম মোহাম্মদ ইদু ২৮ মার্চ, সত্যেন সেনের জন্মশতবার্ষিকী। প্রয়াত সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ...
-
সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: এম এ আজিজ মিয়া বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য...
-
কমরেড সরোজ দত্ত: বাসু আচার্য্য ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২১’শে ফাল্গুন সরোজ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাঙলার...
-
পূর্ণেন্দু দস্তিদার: অগ্নিযুগের বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার। অগ্নিযুগের বিপ্লবী। সশস্ত্র বিপ্লবী। কিংবদন্তি বিপ্লবী...
-
কমরেড রতন সেনের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি: এস.এ রশীদ আজীবন সংগ্রামী, সর্বস্ব ত্যাগী, গরিব মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু কমরেড...
- 1
- 2
- 3
- 4
- 5
- 6
- 7
- 8
হিট পরিসংখ্যান






![]() | আজকের ভিজিটর সংখ্যা | 69 |
![]() | গতকালের ভিজিটর সংখ্যা | 272 |
![]() | এই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা | 69 |
![]() | গত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা | 1302 |
![]() | এই মাসের ভিজিটর সংখ্যা | 862 |
![]() | গত মাসের ভিজিটর সংখ্যা | 4654 |
![]() | সর্বমোট ভিজিটর | 29439 |
Your IP: 38.107.191.102
,
Today: Sep 05, 2010






