সূর্যসেন: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিপ্লবের শ্রেষ্ঠতম লড়াকু বিপ্লবী

১৯২২ সালের শুরুতেই চৌরিচৌরার একটি ঘটনায় গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন এ সময় চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা গণআন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবার উদ্যোগ নিলেন তারা অর্থ, অস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সব রকম প্রস্তুতি নিতে থাকেন নগেনসেনের নেতৃত্বে শুরু হল বিপ্লবীদের সামরিক প্রশিক্ষণ এ সময় বিপ্লবীরা অর্থসংগ্রহের জন্য ডাকাতির আশ্রয়ও নিয়েছিলেন প্রথম ডাকাতি সংগঠিত হয়েছিল আনোয়ারা থানার সরসী বাবুর বাড়িতে

১৯২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর অনন্ত সিংহ, নির্মল সেন প্রমুখের নেতৃত্বে বাটালি পাহাড় এলাকায় রেলের টাকা ডাকাতির সময় কোনো গুলি চালানো হয়নি কারণ ডাকাতি করতে গিয়ে কাউকে আহত করা যাবে না _ এমনটাই ছিল মাস্টারদার নির্দেশ অম্বিকা চক্রবর্তী ও দলিলুর রহমান রেল ডাকাতির সতের হাজার টাকা নিয়ে চলে গেলেন কলকাতায় উদ্দেশ্য অস্ত্র কেনা

ওই বছর ২৪ ডিসেম্বর সূর্যসেনের সহযোগীদের নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলনের অর্থ সংগ্রহের জন্য রেলওয়ের ১৭ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয় পুলিশ তাদের আস্তানায় হানা দেয় পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় যুদ্ধ এই যুদ্ধ নাগরথানা পাহাড়খণ্ড যুদ্ধ নামে পরিচিত যুদ্ধে সূর্যসেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী ধরা পড়েন তাঁদের বিরুদ্ধে সাক্ষী-প্রমাণ না থাকায় তাঁরা দ্রুত ছাড়া পান

জেল থেকে বেরিয়ে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না তিনি আবার শুরু হল সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি ১৯২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় একটি অস্ত্রলুটের ঘটনায় মাস্টারদা জড়িত ছিলেন এ বছর ১ নং বেঙ্গল অর্ডিনেন্স ঘোষণা করে সারা বাংলায় বিপ্লবীদের ব্যাপকহারে গ্রেফতার করা হয় শুধু ২৫ অক্টোবর বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ২০০ বিপ্লবী কর্মীকে গ্রেফতার করা হয় গ্রেফতার হন নেতাজী সুভাষ, অনিলবরণ রায় প্রমুখ নেতারাও চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে কলকাতায় আশ্রয় নেন ওই সময় তাঁরা কলকাতার দক্ষিণেশ্বরে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতেন থাকতেন শোভাবাজারে ১৯২৫ সালের ১০ নভেম্বর সেখানে পুলিশ হানা দেয় সূর্যসেন গায়ের জামা খুলে খালি গায়ে একটা অপরিষ্কার ময়লা গামছা কাঁধে ফেলে চায়ের কেতলি হাতে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসেন পুলিশ তাঁকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সাদাসিদাভাবে বলেন, বাবুলোকদের জন্য চা আনতে যাচ্ছেন পুলিশের দারোগা কিছুক্ষণ জেরা করার পর সন্দেহ করার মতো কোনো কিছু না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর কলকাতার এক মেস থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলাও টেগার্ট হত্যা প্রচেষ্টায় মামলা ১৯২৮ সালে মুক্তি পান

১৯২৯ সালের প্রথম দিকে তিনি চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৩০ সালের শুরু থেকেই তার উদ্যোগে ভবিষ্যৎ সশস্ত্র আন্দোলনের ব্যাপক পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সশস্ত্র অভ্যুত্থানের করার উদ্দেশ্যে নিয়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন কারণ একটাই অস্ত্র সংগ্রহ ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৮ এপ্রিল যুববিদ্রোহ বা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনাকে ভারতের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে সাহসিকতাপূর্ণ কাজহিসাবে চিহ্নিত করেছেন

২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে সুর্যসেনের নেতৃত্বে কয়েকশত পুলিশ-সেনা বাহিনীর সাথে বিপ্লবীদের সম্মুখযুদ্ধ হয় যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ৮০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন নিহত হয় যুদ্ধের এক পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনী পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় যা ছিল দেড়শত বছরের ইতিহাসের মধ্যে ইংরেজ জন্য খুবই অপমানজনক ঘটনা ইংরেজ বাহিনী এদেশের মানুষের কাছে প্রথম পরাজয় তাই এই যুদ্ধের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক সূর্যসেনকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার প্রচুর টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে এ সময় তাঁকে কিছু দিনের জন্য আত্মগোপনে থাকতে হয় ১৯৩১ সাল জুড়ে আত্মগোপনে তিনি ১৯৩২ সালের ১৩ জুন সাবিত্রী চক্রবর্তীর বাড়িতে তাঁকে ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হয় ব্রিটিশ পুলিশ

১৯৩২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাষ্টারদার প্রীতিলতাকে বললেন, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব তোমাকে নিতে হবে তারপর প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাত্রে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে সফল হন আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন এ অবস্থায় ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মাহত্যা করেন কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশ পুলিশের মারের মুখে ফাঁস যেতে পারে, তাই দেশমাতৃকার জন্য নিজেকে আকুণ্ঠভাবে উৎসর্গ করলেন

১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে ১০ মাইল দূরে পটিয়া থানার গৈরিলা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে তিনি আত্মগোপন ছিলেন তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রজেন সেন, কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত নগেনসেন নামের এক বিশ্বাসঘাতক এ খবর পৌঁছে দিল ব্রিটিশ পুলিশের কাছে পুলিশ-বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে শুরু হয় এক লড়াই অবশেষে পুলিশ গ্রেফতার করে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনকে গ্রেফতারের পর মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনের ওপর চালানো হয় বর্বর অত্যাচার হাত-পা শিকলে বেঁধে মাস্টারদাকে নিয়ে যায় চট্টগ্রামে ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁদের জেলে পাঠায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসক মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির হুকুম জারি

১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি দিবাগত রাত বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন এবং তাঁর সহকর্মী তারকেশ্বর দস্তিদার নিঃশঙ্কচিত্তে ব্রিটিশের ফাঁসির রজ্জুতে হাসি মুখে জীবন বিসর্জন দিলেন

সম্পাদনায়ঃ শেখ রফিক

 

 

Comments (4)Add Comment
0
সূর্য শেন সম্পর্কে আরো জানতে চাই।
written by তৌহিদ রেজা, January 17, 2010
সূর্য শেন সম্পর্কে আরো জানতে চাই। তার ছবি কি আর নেই?
0
...
written by Meghnad Kapalik, January 17, 2010
This is a test comment
0
surzosen
written by Sazzan, January 19, 2010
বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন এবং তাঁর সহকর্মী তারকেশ্বর দস্তিদার নিঃশঙ্কচিত্তে ব্রিটিশের ফাঁসির রজ্জুতে হাসি মুখে জীবন বিসর্জন দিলেন। আরো জানতে চাই।

0
biplob
written by zarin tasnim haider, July 28, 2010
we all should follow this revoluter for what he did for our subcontinent.

Write comment

busy

আরও পড়ুন

  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • 8

হিট পরিসংখ্যান

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterআজকের ভিজিটর সংখ্যা68
mod_vvisit_counterগতকালের ভিজিটর সংখ্যা272
mod_vvisit_counterএই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা68
mod_vvisit_counterগত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা1302
mod_vvisit_counterএই মাসের ভিজিটর সংখ্যা861
mod_vvisit_counterগত মাসের ভিজিটর সংখ্যা4654
mod_vvisit_counterসর্বমোট ভিজিটর29438

We have: 2 guests, 1 bots online
Your IP: 38.107.191.104
 , 
Today: Sep 05, 2010
এখন পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটের হিট24613