ভারতীয় উপমহাদেশ
কমরেড সরোজ দত্ত: বাসু আচার্য্য
কমরেড সরোজ দত্ত: বাসু আচার্য্য
১৩২১ বঙ্গাব্দের ২১’শে ফাল্গুন সরোজ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাঙলার (অধুনা বাঙলাদেশের) যশোর জিলার নড়াইল গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারে। তাঁর বাবার নাম হৃদয়কৃষ্ণ দত্ত, মা কিরণবালা দত্ত। নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর ১৯৩০ সালে কলকাতায় আসেন স্কটিশ চার্চ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে।
ওই একই কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে ইংরাজি নিয়ে সাম্মানিক স্নাতক হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে ভর্তি হন। কলেজে থাকতেই কম্যুনিস্ট পার্টির গণসংগঠনে যোগদান করেন এবং কিছুদিনের কারাবাস ভোগ করেন। ১৯৩৮ সালে M.A. পাস করার পর তিনি যোগদান করেন প্রগতি লেখক সঙ্ঘে। পরের বছর, ১৯৩৯-এ, আশুতোষ কলেজ হলে প্রগতি লেখক সঙ্ঘের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কবি বুদ্ধদেব বসু ও সমর সেন যথাক্রমে, ‘Bengali Literature Today: Position of Modern Writers’ এবং ‘In Defence of Decadents’ রচনা দুটি পাঠ করেন। ‘অগ্রণী’ পত্রিকার পাতায় সরোজ দত্ত এর উত্তর দেন। ‘অতি আধুনিক বাঙলা কবিতা’ এবং ‘ছিন্ন করো ছদ্মবেশ’ শিরোনামে লেখা প্রবন্ধে প্রগতিশীলতার ছদ্মবেশে ধেয়ে আসা বুর্জোয়া এলিটিজম কে আক্রমণ করেন তিনি। সমর সেনের সাথে এই বাদ-প্রতিবাদ অনেকদূর গড়ায়। এই সময় থেকেই সরোজ দত্তর কবিতা প্রকাশ হতে শুরু করে। ১৯৩৯ সালে সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন অমৃতবাজার পত্রিকাতে। ১৯৪০-এ তাঁর লেখা দুটি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যার গায়ক ছিলেন সুধীন চট্টোপাধ্যায়।
সামনের দিকে এগিয়ে যাবার আগে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে সরোজ দত্তের ধ্যান-ধারণার নিয়ে স্বল্প-পরিসরে আলোচনা করে নেওয়া দরকার। ‘In Defence of Decadents’ বা ‘অবক্ষয়বাদীদের সমর্থনে’ রচনায় সমর সেন মশাই অনেক শব্দ খরচ করে, উৎপাদন-এর শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের প্রশ্ন কে সামনে রেখে অসাধারণ চাতুর্যের সাথে তুলে ধরেছিলেন—যেহেতু অবক্ষয় বিষয়টা বুর্জোয়া সমাজের একটা বাস্তবতা, অতএব একে সমালোচনা বা তিরস্কার না করে শুধুমাত্র চিত্রিত করাটাই প্রগতিশীলতার পরিচয়ক। বলা বাহুল্য, এই এলিওটিয় মতামতকে সরোজ দত্ত সমর্থন করতে পারেননি। কার্ল রাডেকের মতই এলিওটপন্থীদের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন ফ্যাসিবাদের ছায়া। তবে, এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার, এলিওট কে ফ্যাসিবাদী বলাটা oversimplification; তিনি নিতান্তই একজন ‘রানিং কমেন্টেটর অব ডেকাডেন্স’। যাইহোক, শিল্পের একটা সোশ্যাল ফাংশন থাকে সব সময়ই। তার কাজ শুধুমাত্র সমাজের আয়না হয়ে ওঠা নয়—তার কাজ সমাজ কে গঠন করা, এবং সেই ক্ষেত্রে ডেকাডেন্ট সমাজের বাই-প্রোডাক্টগুলোর স্থান যে বিপ্লবী বা প্রগতি আন্দোলনে সহায়ক নয়, বরং চুড়ান্তভাবে ক্ষতিকারক, এটা না বললেও চলে। ডেকাডেন্সের অবশেষটাকে ছুঁড়ে ফেলেই প্রগতির পথে যাত্রা সম্ভব—পুরনো জন্মদাগগুলো এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে অন্তরায় ছাড়া কিছুই নয়।
আগের কথার রেশ টেনে, সরোজ দত্তর কবিতার বিষয়েও দু-চারটে কথা বলা দরকার। বিনয় ঘোষ তাঁর ‘সাম্প্রতিক বাঙলা কবিতা’ প্রবন্ধে সরোজ দত্তর কবিতার বৈপ্লবিক স্বরূপ, তার ছন্দবদ্ধতা, শব্দের ঋজু ব্যবহার, আবেগের বুদ্ধিদীপ্ত সংমিশ্রণ, ইত্যাদির প্রশংসা করে তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন - “ভবিষ্যতে মানুষের মহাতীর্থ গঠনের স্বপ্নে মশগুল তরুণ কবি সরোজ কুমার দত্ত প্রাক্তন সংস্কৃতি এবং সাহিত্য থেকে সাম্যবাদী এমন সব উপাদান শ্রদ্ধার সঙ্গে সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করবেন যাতে ভবিষ্যতের ভিত গঠনের কাজ সুসম্পন্ন হয়। …তাঁর কবিতার সুগভীর ছন্দ শুধু বাঙলার সংস্কৃত-পন্থী কবিদেরই স্মরণ করিয়ে দেয় না, অমিত্রাক্ষর ছন্দেও তিনি মাইকেলি ভঙ্গি বজায় রেখে স্বকীয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। শব্দগুলো তাঁর যেমন কাঠিন্যে উজ্জ্বল, তেমনি নিবিড় আবেগে কম্পমান, তাদের সম্মিলিত সুর দীপ্ত কন্ঠের ঘোষণার মত শোনায়।”
ফর্মের দিক থেকে সরোজ দত্ত কোন ভাঙচুর করেননি। সহজ সরলভাবে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে মাত্রা, অক্ষর, সুর আর ধ্বনির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে ক্লেদমুক্ত নতুন সমাজ গঠনের কথা বলেছেন। প্রশ্ন জাগে, যাঁর কলমের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল ঈর্ষণীয়, তিনি কি এই ফর্ম ভাঙার কাজটা করতে পারতেন না? প্রয়াত কবি বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিতকে একবার এই বিষয়ে জিগ্যেস করাতে তিনি হেসে স্মৃতির পাতা উলটে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন – “তখন আমি ছাত্র। বিভিন্ন কাগজে কবিতা বেরোতে শুরু করেছে। আমরা কয়েকজন একদিন ‘স্বাধীনতা’র [অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মুখপাত্র – লেখক] অফিসে গেলাম লেখা জমা দিতে। সরোজবাবু বসে ছিলেন। এডিটোরিয়াল বোর্ডের সদস্য ছিলেন তখন। আমার লেখা দেখে বললেন, “ভালই তো লেখ, কিন্তু এই ভাষা, এই ধরণের শব্দের ব্যবহার তো এই পত্রিকার পাঠকের জন্যে নয়। সহজ কথাটা সহজভাবে বল। আমাদের পাঠকরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তারা ফর্মের অত প্যাঁচ-পয়জার নিয়ে মাথা ঘামান না।”
সরোজ দত্ত সহজভাবে মানুষের কথা বলতে চেয়েছিলেন—পৌঁছতে চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মননে। মাও’র মতই তিনি ট্র্যাডিশনাল ভার্স স্ট্রাকচারকে ভাঙ্গতে চাননি। একটা বাঁধা ছকের উপর দাঁড়িয়েই হয়তো চেয়েছিলেন কন্টেন্টের সাবলীল কম্যুনিকেশন। এই কারণেই হয়তো ওনার কবিতায় সংস্কৃত কাব্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পুরাণ কথার ব্যবহারের পেছনে সম্ভবতঃ একই চিন্তা কাজ করছে। কনভেনশনাল বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আঘাত করার জন্যে সূক্ষ্মভাবে পুরাণের পুনঃনির্মাণও করেছেন তিনি। এই ক্ষেত্রে অবশ্য পাঠ্য তাঁর ‘শকুন্তলা’ কবিতা। কাব্যভাষার দিক থেকে কোন নতুন সংযোজন না করলেও পুরাণকে অন্যভাবে দেখার ক্ষেত্রে বাঙলা তথা ভারতীয় সাহিত্যে ‘শকুন্তলা’-র জুড়ি মেলা ভার। এক বিখ্যাত তেলুগু কবির কাছে শুনেছিলাম, তিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘শকুন্তলা’ পড়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন—ঠিক করেছিলেন, যে করে হোক সরোজ দত্তর সব কবিতা অনুবাদ করবেন। হ্যাঁ, আজ তাঁর প্রায় সব কবিতাই অনুদিত হয়েছে তেলুগু ভাষায়। আঙ্গিকের দিক থেকে না হলেও, বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় সরোজ দত্ত চার্বাকগুরু বৃহস্পতি-তুল্য। রবীন্দ্রনাথের মত উপনিষদীয় ‘মাখন’ মাখিয়ে তিনি গর্ভিণী শকুন্তলা কে দেখেননি, দেখেছেন একজন অরক্ষিতা অরণ্যকুমারীর উপর প্রিভিলেজড ক্লাসের সেক্সপ্লয়টেশনের নিদর্শন হিসাবে -
“দুর্বাসার অভিশাপ, অভিজ্ঞান অঙ্গুরী কাহিনী
স্বর্গমিলনের দৃশ্য, মিথ্যাকথা হীন প্রবচনা—
রাজার লালসা-যূপে অসংখ্যের এক নারীমেধ
দৈবের চক্রান্ত বলি রাজকবি করেছে রটনা।
গৃহস্বামী দেশান্তরে, অরক্ষিতা দরিদ্রের ঘরে
নারীমাংস লোভে রাজা মৃগমাংস এল পরিহরি—
অরুচি হয়েছে যার অবিশ্রাম নাগরীবিহারে
তাহার কথার ফাঁদে ধরা দিল অরণ্যকিশোরী।
স্তব্ধ আজি নাট্যশালা, নান্দীমুখ আতংকে নির্বাক
বিদীর্ণ কাব্যের মেঘ, সত্যসূর্য উঠেছে অম্বরে—
দর্শক শিহরি করে নাটিকার মর্মকথা পাঠ,
‘বালিকা গর্ভিণী হল লম্পটের কপট আদরে’—
রাজার প্রসাদভোজী রাজকবি রচে নাট্যকলা,
অন্ধকার রঙ্গভূমি, ভুলুন্ঠিতা কাঁদে শকুন্তলা।”

আরও পড়ুন
-
সত্যেন সেন : মেহনতি মানুষের এক পরম সুহৃদ_গোলাম মোহাম্মদ ইদু ২৮ মার্চ, সত্যেন সেনের জন্মশতবার্ষিকী। প্রয়াত সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ...
-
সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: এম এ আজিজ মিয়া বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য...
-
কমরেড সরোজ দত্ত: বাসু আচার্য্য ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২১’শে ফাল্গুন সরোজ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাঙলার...
-
পূর্ণেন্দু দস্তিদার: অগ্নিযুগের বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার। অগ্নিযুগের বিপ্লবী। সশস্ত্র বিপ্লবী। কিংবদন্তি বিপ্লবী...
-
কমরেড রতন সেনের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি: এস.এ রশীদ আজীবন সংগ্রামী, সর্বস্ব ত্যাগী, গরিব মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু কমরেড...
- 1
- 2
- 3
- 4
- 5
- 6
- 7
- 8
হিট পরিসংখ্যান






![]() | আজকের ভিজিটর সংখ্যা | 72 |
![]() | গতকালের ভিজিটর সংখ্যা | 272 |
![]() | এই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা | 72 |
![]() | গত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা | 1302 |
![]() | এই মাসের ভিজিটর সংখ্যা | 865 |
![]() | গত মাসের ভিজিটর সংখ্যা | 4654 |
![]() | সর্বমোট ভিজিটর | 29442 |
Your IP: 38.107.191.103
,
Today: Sep 05, 2010






