পূর্ণেন্দু দস্তিদার: অগ্নিযুগের বিপ্লবী

পূর্ণেন্দু দস্তিদারঅগ্নিযুগের বিপ্লবী। সশস্ত্র বিপ্লবী। কিংবদন্তি বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী সহযোদ্ধা। তিনি ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী স্টুডেন ক্যাডারও। তাঁর কাজ ছিল তরুণ যুবক ও ছাত্রদেরকে বিপ্লবী দলে এনে বিপ্লবীমন্ত্রে দীক্ষিত করা। এমনকি নিজ দলের বিপ্লবীদেরকেও তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন কলা-কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন।

পূর্নেন্দু দস্তিদারের ভাই অর্ধেন্দু দস্তিদার জালালাবাদ যুদ্ধের শহীদ, হেমেন্দু দস্তিদার জালালাবাদ যুদ্ধের অগ্রসেনানী। সুখেন্দু ও শরদিন্দু দস্তিদার বিপ্লবের অপর দুই নাম। বস্তুত ধলঘাট দস্তিদার পরিবারের ইতিহাস ছাড়া উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হওয়া অসম্ভব। সকল বিতর্কের উর্দ্ধে পূর্ণেন্দু দস্তিদার এখনো সসম্মানে স্ব-আসনে দেদীপ্যমান। সে যুগে আমাদের কাছেও তিনি তাই ছিলেন।”-- অরুণ বিকাশ দত্ত

এছাড়াও পূর্ণেন্দু দস্তিদারই প্রথম বিপ্লবী দলে নারীদের অন্তর্ভূক্ত করেন। তখনকার দিনে সশস্ত্র বিপ্লবী দলে নারীদেরকে নানা কারণে নেয়া হতো না। তার মধ্যে একটা অন্যতম কারণ ছিল; বিপ্লবীরা নারী সংস্পর্শে এলে বিপ্লবী পথে-মতে জীবন উৎসর্গ করতে দিধা-দ্বন্দ্ব ভুগবে। তিনি এধারণা পালটে দেন। বিপ্লবী দলে তিনি কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতাসহ আরো অনেক নারীকে সংগঠিত করেন। সূর্য সেন প্রথম দিকে বিপ্লবী দলে নারীদের অন্তর্ভূক্ত করার ব্যাপারে বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি তার সিদান্ত পরিবর্তন করে পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কথা মেনে নেন।

অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম” গ্রন্থে অনন্ত সিংহ লিখেছেনঃ “আমাদের বিপ্লবী দলে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতাসহ আরো অনেক মেয়ে ছিল। আমরা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতামও না। যখন ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ আমাদের বিরুদ্ধে ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ নাম দিয়ে মামলা চালাচ্ছিল, তখন আমরা কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতার নাম শুনতে পাই”।

ভারত উপমহাদেশের বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই-সংগ্রাম সংগঠিত হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় ভারত স্বাধীন হয়, তাঁর মূলে যে সকল বিপ্লবীর নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁদের মধ্যে পূর্ণেন্দু দস্তিদার একজন অন্যতম বিপ্লবী।

১৯৩০ সালের মাস্টার দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত যুব বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে কলকাতায় গ্রেফতার করে ব্রিটিশ পুলিশজীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয় জেলেআর জেলে বসে তিনি রচনা করেন তাঁর বেশির ভাগ গ্রন্থ। এসব গ্রন্থে তিনি তুলে আনেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও ত্যাগের কথা। তিনি বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে যুক্ত করেন সাহিত্যের এক নতুন ধারা, বিপ্লবী রাজনৈতিক সাহিত্য।

পূর্ণেন্দু দস্তিদারের জন্ম ১৯০৯ সালের ২০ জুনচট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার ধলঘাট গ্রামেতাঁর বাবা চন্দ্রকুমার দস্তিদার। তিনি ছিলেন আইনজীবী। চন্দ্রকুমার দস্তিদার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করার পর চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেন। তাঁর মা কুমুদিনী দস্তিদার।

পূর্ণেন্দু দস্তিদারের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। শৈশবে তাঁর শিক্ষা জীবন চট্টগ্রামেই শুরু হয়। অল্প বয়সে তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। দুরন্ত চঞ্চল মেধাবী এই বালক ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতমাতাকে মুক্তি করার জন্যই মূলত: রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। পড়াশুনা আর রাজনীতির অধ্যায়ন ছিল তাঁর ছাত্র জীবনের একমাত্র কাজ। ১৯২৩ সালে তিনি যুক্ত হন বিপ্লববাদী দলে। পড়াশুনা আর দেশের স্বাধীনতার জন্য দৃঢ়চিত্তে শুরু অক্লান্ত পরিশ্রম। ১৯২৫ সালে সশস্ত্র বিপ্লববাদী দলের সাথে যুক্ত অবস্থায় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হন। এসময় তাঁকে যুব বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কলকাতায় গ্রেফতার করা হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে জেলে থাকার কারণে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি। ১৯৩৪ সালে তিনি দেউলি জেল থেকে ডিস্টিংশনসহ বি..পাসের স্বীকৃতি অর্জন করেনএরপর তিনি এক পর্যায়ে বি.এল. ডিগ্রি অর্জন করতে সক্ষম হন।

অবশেষে ১৯৪০ সালে তিনি জেল থেকে মুক্ত হন। বিপ্লবী রাজনীতির পাশাপাশি চট্টগ্রাম আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ নবগঠিত পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান শাখার সদস্য নির্বাচিত হনএকই বছর বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে পাকিস্তান পুলিশ পুনরায় তাঁকে গ্রেফতার করে১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জেলে আটক থাকা অবস্থাতেই চট্টগ্রাম জেলার হিন্দু আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী বিনোদবিহারী দত্তকে পরাজিত করে তিনি পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন

১৯৫৫ সালের ৯ জুন জেল থেকে মুক্তি পানপূর্ববঙ্গ পরিষদে তৎকর্তৃক চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের (১৮ এপ্রিল ১৯৩০) স্মারকস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপন করেনপ্রস্তাবটি ব্যবস্থাপক সভায় গৃহীত হয় ১৯৫৬ সালে১৯৫৭ সালের ২৬ জুলাই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়। এ সময় তাঁকে আবারো গ্রেফতার করে পাকিস্তান পুলিশ১৯৬২ সালে তিনি মুক্তি পান। ওই বছর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চট্টগ্রাম শহর কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে আরেকবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়

১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণ-আন্দোলনের চাপে অন্যান্য তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে তিনিও মুক্তি পান১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে ন্যাপের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রার্থী সুলতান আহমদের ভোট ডাকাতির কারণে তিনি পরাজিত হন

১৯৭১ সালের ৯ মে পূর্ণেন্দু দস্তিদার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারত গমন করেন। দেমাগিরি বর্ডার দিয়ে সীমান্ত পাড় হবার পর তিনি মারা যান। যদিও তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেকে সন্দেহ করেন যে, তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে।

প্রকাশিত গ্রন্থ: কবিয়াল রমেশ শীল (১৯৬৩), স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম (১৩৭৪), বীরকন্যা প্রীতিলতা (১৩৭৭)

অনূদিত গ্রন্থ: শেকভের গল্প (১৯৭০), মোপাশাঁর গল্প

Comments (0)Add Comment

Write comment

busy

আরও পড়ুন

  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • 8

হিট পরিসংখ্যান

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterআজকের ভিজিটর সংখ্যা72
mod_vvisit_counterগতকালের ভিজিটর সংখ্যা272
mod_vvisit_counterএই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা72
mod_vvisit_counterগত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা1302
mod_vvisit_counterএই মাসের ভিজিটর সংখ্যা865
mod_vvisit_counterগত মাসের ভিজিটর সংখ্যা4654
mod_vvisit_counterসর্বমোট ভিজিটর29442

We have: 2 guests, 1 members online
Your IP: 38.107.191.104
 , 
Today: Sep 05, 2010
এখন পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটের হিট24628