এম এন রায়: উদিতা বিশ্বাস

 

altপাখিরা যেমন বিস্তৃত সীমাহীন আকাশে পাখা মেলে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ায়। ঠিক তেমনি স্বাধীনভাবে মানুষও পাখির মতই বাঁচবে। সেখানে থাকবে না কোনো শোষণ, বৈষম্য অন্যায়-অবিচার, থাকবে না কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা। সব মানুষের একটি দেশ থাকবে, যার নাম হবে “সাম্য- ভালবাসার পৃথিবী।

এমন মতাদর্শ যে মানুষটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবার জন্য কখনো ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, রাশিয়া কখনো বা এশিয়ার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই বিপ্লবীর নাম এম. এন. রায়।

কাঁদা মাটি দিয়ে যেমন সুন্দর করে কুমার মাটির পাত্র তৈরি করে, তেমনটি উপযুক্ত পরিবেশও মানুষকে সঠিকভাবে বিকাশিত করে। এম. এন. রায়ও ঠিক বড় হয়েছিল একটি কুসংষ্কার মুক্ত পরিবারে। যা তাঁর চিন্তা-প্রজ্ঞাকে বিকাশিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাহায্য করে।

তাঁর আসল নাম নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তিনি পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার আর বেলিয়া গ্রামে ১৮৮৭ সালের ২২ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান তিনি। ১৮৯৭ সালে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। স্কুল জীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯০৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। কিশোর বয়স থেকেই তিনি নানা বিষয়ে গভীর ভাবে পড়াশোনা করতেন। কারণ তিনি জানতেন যে, পড়াশোনা ছাড়া মানবমুক্তির আলোর পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন যখন সারা ভারতবর্ষকে আলোড়িত করল, তখন দেশ, মা, মাটির প্রতি তীব্র ভালোবাসা নরেন্রনাথকে আঁকড়ে ধরলো। তাই পড়াশোনা ত্যাগ করে তিনি বিপ্লববাদী অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন তুখোড় সংগঠক। তিনি কিশোর বয়সেই উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন যে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করতে হলে অস্ত্রের প্রয়োজন। তাঁর জন্য লাগবে অর্থ। তাই তাঁরই নেতৃত্বে ১৯০৭ সালে চিড়িং পোতা রেলস্টেশনে লুট করা হয়। এটাই উপমহাদেশে প্রথম কোন রাজনৈতিক ডাকাতি।

১৯১০ সালে তিনি গ্রেফতার হন। তাঁর বিরুদ্ধে উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণ উপস্থিত করতে না পারায় তিনি মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়ে কঠিন সংকটময় পথ পাড়ি দিয়ে ডাচ-ইষ্ট-ইন্দোচীন প্রভৃতি বহু অঞ্চলে গিয়েছেন। সেখানে পৌঁছে বৈপ্লবিক সংগঠনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতেন।

তিনি ১৯১৩ সালে ইন্ডিয়া ইকুইটেবল ইনসিওরেঞ্চ কোম্পানীতে চাকরি নেন। পরে চাকরি ছেড়ে হোটেল খোলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ সৈন্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা। তখন তিনি পৃথিবীর নানা স্থান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে দক্ষিণ এশিয়ায় মজুত করেন। এ সময়ে নরেন্দ্রনাথ বুঝতে পারেন যে, দেশের মেহনতি কৃষক-শ্রমিকদের সুংসগঠিত না করে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব করা হবে ভুল।

১৯১৫ সালে নরেন্দ্রনাথ সি, মার্টিন ছদ্মনামে দেশ ত্যাগ করেন। নরেন্দ্রনাথ জার্মান হয়ে আমেরিকা আসেন। সেখানে এসে তিনি অতীতের সকল নাম মুছে নতুন আর একটি ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। সে নামটি হচ্ছে এম. এন. রায় (মানববেন্দ্রনাথ রায়)। আর এ নামেই তিনি অধবদি বিশ্বের সমস্ত মানুষের কাছে পরিচিত। “এই নাম তাকে ব্যর্ত অতীত থেকে রোমান্টিক ও কৃতিত্বপূর্ণ ভবিষ্যতে দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ভাবনার জগতে এক নতুন দিক উন্মোচন হয়। তিনি যুক্তিবাদ ও বুদ্ধির ওপর সুদৃঢ় আস্থা স্থাপন করে তার জীবনকে বিকাশিত করতে লাগলেন। এ সময় তিনি আমেরিকা ও মেক্সিকোতে ঘুড়ে বেড়িয়েছেন। ঠিক তখন স্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ইভলিন ট্রেন্টের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। পরে তাকে বিয়ে করেন।

১৯১৬ সালে নিউইয়র্ক চলে আসেন। সেখানে তাঁর সাথে দেখা হয় লালা লাজপতি রায়ের। লালাজি ছিলেন একজন মার্কসপন্থী। এখানেই রায় মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং মার্কসবাদ চর্চা করতে লাগলেন। এভাবেই তিনি পেয়ে যান মানবমুক্তির এক আলোকিত দিক-নির্দেশনা। মার্কসবাদ খুব সহজেই আতস্থ করেন। লালজির সাথে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেন। একদিন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি সভা শেষ করে ফিরার পথে গ্রেফতার হন। জামিনে ছাড়া পাবার পর মার্কিন গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে মেক্সিকোতে পালিয়ে যান। এখানে ও কিছু দিনের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পান। তিনি যেখানে গিয়েছেন সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতি, সহজেই রপ্ত করে নিতে পারতেন। এটা তাঁর একটা অসাধারণ গুণ। তিনি স্পেনীশ ভাষা শিখে মেক্সিকোর পত্রিকায় লেখা লেখি করতেন। ফলে মেক্সিকোর বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদদের মধ্যে তাঁর নাম ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এবং কিছুদিরে মধ্যে সেখানকার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।

১৯১৭ সালে মার্কিন আগ্রাসন মোকাবেলা করতে সোস্যালিষ্ট পার্টি গড়ে তোলেন। তার একটি উদ্দেশ্যই ছিল সোসালিষ্ট পার্টিকে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের রূপান্তর করা। এজন্য তিনি একটি ম্যানিফেষ্টো রচনা করেন। এই ম্যানিফেষ্টো সারা মেক্সিকোতে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল এদিকে রাশিয়াতে ঠিক ঐ সময় লেলিনের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়। সমাজতন্ত্র যে কেবলই স্বপ্ন নয়, বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। এটা পৃথিবীর সকল মানব জাতির কাছে প্রমাণিত হল। ফলে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া গেল।

১৯১৮ সালে মেক্সিকোর সোস্যালিষ্ট পার্টির প্রথম সম্মোলন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বসম্মতি ক্রমে রায় পার্টির জেনারেল সেক্রেটারী নিযুক্ত হন। ঔ সম্মেলনে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। দক্ষিণ ও মধ্যে আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ল্যাটিন আমেরিকান লীগ গঠন করা হয়। সেখানে আহবায়ক কমিটির সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। একই সালে রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির একজন নেতা মাইকেল বারোর সঙ্গে রায়ের পরিচয় হয়। রায় মাইকেল বারোর কাছ থেকে মার্কসবাদ, ইউরোপীয় দর্শন, ইউরোপীয় সভ্যতা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ পান। ১৯১৯ সালে রায় বারোর সহযোগিতা নিয়ে সর্বসম্মতি ক্রমে সোস্যালিষ্ট পার্টিকে কমিউনিষ্ট পার্টিতে রূপদান করেন। এটাই ছিল রাশিয়ার বাইরে পৃথিবীর সর্বপ্রথম কমিউনিষ্ট পার্টি।

১৯২০ সালে রায় লেনিনের আমন্ত্রণে মস্কো আসেন। সেখানে রায়ের সঙ্গে লেনিন, ট্রটস্কি, জিনোভিয়েভ ও পরবর্তীতে জে. স্তালিনের সঙ্গে সাক্ষাত হয়। রায় ও লেনিনের সাক্ষাত একটি উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা। স্বদেশ রঞ্জন দাস লেলিন ও রায়ের সাক্ষাত সম্পর্কে লিখেছেন-“লেনিন চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে রায়কে সম্বর্ধনা জানিয়ে ছিলেন প্রথম সম্ভাষণ হলো- রায়ের ভয়মিশ্রিত বিস্ময় কেটে গেল। লেনিনের চোখে দেখলেন দুষ্টুমিভরা হাসির আভাস। এতদিন রায় লেনিনের ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে শুনে এসেছিলেন মস্তিস্কের গুরুভারে লেনিনের হৃদয় মরে গিয়েছে। লেনিনের মানবিক কামনা-বাসনা ভাবাবেগ বলতে আর কিছুই নেই। লেনিন একটি যন্ত্র বিশেষ। কিন্তু এই ধারনা নিমেষেই দূর হয়ে গেল। যে হাসির আভাস লেনিনের মুখে ফুটে উঠল তাতে রায় স্পষ্ট বুঝলেন, এ হাসি উপহাসের হাসি নয়- এটি নিছক আশাবাদীর হাসি। মার্কসবাদ যে সর্বশেষ সত্য, কেবল তাই নয়- এর অবশ্যম্ভবী জয় সম্বন্ধে ও স্তির বিশ্বাস্” লেনিন তার ঔপনিবেশিক সংক্রান্ত থিসিসটি রায়কে দেন এবং সমালোচনা ও পরামর্শ চান। উপনিবেশগুলোর বৈপ্লবিক কৌশল সম্পর্কে লেনিন যে থিসিস লেখেন তার সাথে রায় একমত পোষণ করে নি।

কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের দ্বিতীয় কংগ্রেসে রায় আলাদাভাবে লিখিত বক্তব্য কংগ্রেসে পাঠ করেন। এবং এ থিসিসটি কংগ্রেসে লেনিনের থিসিসটি পরিশিষ্ট হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু লেনিন কংগ্রেসকে রায়ের থিসিসটিকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছিলেন। এরপর তিনি ভারতে ফিরে আসেন।

১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাশখন্দে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি গঠন করা হয়। যার সেক্রেটারী ছিলেন এম. এন. রায় ১৯২২ সালে তৃতীয় বিশ্ব আন্তর্জাতিকের অধিবেশন বসেছিল মস্কোতে। সেখানে গান্ধীকে নিয়ে লেনিনের ও রায়ের মধ্যে মতপার্থক্য হয়। কারণ লেনিন গান্ধীকে বিপ্লবী ভাবতেন। লেনিনের ধারণা ছিলো উরোপের মধ্যযুগের বিপ্লবীদের মতো গান্ধী ও একজন বিপ্লবী। আর রায় গান্ধী সম্পর্কে বলেন “গান্ধীর ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শ নিতান্তই- প্রতিক্রিয়াশীল। সুতরাং লেনিনের এ ধারণা যুক্তি সংগত নয়।”

১৯২৪ সালে কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের সভাপতি মন্ডলীর সম্পাদক ও হন। ১৯২৪-১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিম ইউরোপে ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি জার্মান, ফ্রান্সে কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে পরিচালনার কাজ করেন। ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে কমিউনিষ্ট ইন্টারন্যাশনালে কার্যকরী সমিতির এক সভা বসে। এ অধিবেশনে রায় আবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়।

১৯২৭ সালের মে মাসে চীনা কমিউনিষ্টর পার্টি পঞ্চম কংগ্রেসের তাঁর পরামর্শ গৃহীত হয়। চীন থেকে তিনি বার্লিন ও মস্কোতে যান। সেখানে এক বছর কাটান। এ সময় ইভলিন ট্রেন্টের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তিনি মস্কোতে ফিরে আসেন। সেখানে আন্তর্জাতিক কমিউনিষ্ট সংস্থার কার্যকরী সমিতির নবম সভাতে যোগদান করেন। সভা চলা-কালীন সময়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে তিনি ভারতে চলে আসেন। আত্মগোপন অবস্থায় তিনি শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। রায় ১৯৩১ সালের ২১ জুলাই বোম্বাইয়ের এক হোটেল থেকে গ্রেফতার হয়। পুলিশ রায়ের বিরুদ্ধে কানপুর যড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪) দায়ের করেন। তাকে ১২ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। পরে আপিল করা হলে ৬ বছর মেয়াদ যথাযথ ব্যবহার করেন। এ সময় তিনি প্রচুর লেখাপড়া করতেন। এবং প্রচুর লেখালেখি করতেন। তিনি জেলখানাতেই বসে- বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ও বই রচনা করেন। তাছাড়া প্রচুর প্রবন্ধ তিনি রচনা করেন। রায় জেলে বসেই কংগ্রেসের মধ্যে কাজ করার কথা ভেবেছিলেন।

১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি কংগ্রেসে যোগদান করেন। রায় এ সম্পর্কে বলেন- “বুদ্ধিজীবী ও ধনীদের হাতে কংগ্রেসের নেতৃত্ব থাকলেও জনগণ কংগ্রেসকে সমর্থন করে। কংগ্রেস হলো ভারতীয়দের জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কমিউনিষ্টদের উচিত কংগ্রেসের মধ্য থেকেই কাজ করা। এবং ধীরে ধীরে কংগ্রেসেকে মাকর্সবাদী রাজনীতি গ্রহণ করানো” কিন্তু তার এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল তা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়। রায়ের সাথে গান্ধীর শুরু থেকেই মতপার্থক্য দেখা যায়। ফলে কংগ্রেসের মত একটি বুর্জোয়া শ্রেণীর দল মার্কসবাদকে প্রত্যাখান করেন।

১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের ওয়াকিং কমিটির বৈঠকে গান্ধীকে সমস্ত ক্ষমতা অর্পন করা হয়। ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষ বসু সভাপতি হয়। গান্ধীবাদীরা সুভাষ বসুকে বিরোধিতা করেন। পরে সুভাষ বসু পদত্যাগ করেন কংগ্রেস থেকে। ১৯৩৯ সালের ২৬ মার্চ কংগ্রেসের অভ্যন্তরে লীগ অব র্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন নামে এক সংহতি গঠন করা হয়।

১৯৪০ সালে অক্টোবরেই রায় কংগ্রেসকে ত্যাগ করেন। এ বছরেই লীগ অব র‌্যাডিক্যাল কংগ্রেস- এর সিদ্ধান্ত হলো যে, লীগের সমস্ত সভ্য কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবে এবং সংগঠনের নতুন নাম হবে “র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টি”। ১৯৪০ সালের রূশ জনগণকে আহবান জানান এবং বলেন- “ফ্যাসিবাদ ধ্বংষ হোক, ইংল্যান্ড ও ভারতের ফ্যাসিষ্ট এজেন্টরা নিপাত যাক, ফ্যাসিবারে বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত বৃটিশ গণতন্ত্রকে সমর্থন কর, দুনিয়ার গণতন্ত্রী এক হয়, এই যুদ্ধকে জনযুদ্ধে পরিণত করা, সোভিয়েত ইউনিয়ন জিন্দাবাদ, ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিশ্ব সংঘ গড়ে তোল।”

১৯৪২ সালে কংগ্রেসের “ভারত ছাড়” আন্দোলনের বিরোধীতা করার জন্য রায় ও র‌্যাডিক্যালদের অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। ১৯৪৪ সালে র‌্যাডিক্যাল পার্টির দ্বিতীয় সম্মেলনে স্বাধীন ভারতের সংবিধানে খসড়া গৃহীত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতে যে পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয় সে আশাংঙ্কার কথা তিনি তাঁর খসড়া সংবিধানের ভূমিকায় উল্লেখ করেছিলেন। তিনি মানবমুক্তির জন্য সারা জীবন কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন রক্তে মাংসে জাত বিপ্লবী। ১৯৪৭ সালের আগষ্টে নতুন দার্শনিক মতবাদ রচনা করেন। যা নব্য মানবতাবাদ নামে পরিচিত। রায় নব্য মানবতাবাদের ২২টি সূত্র দেন। এ দর্শনের মূল কথা হলো বিকাশিত ব্যক্তিত্ববাদ। ব্যক্তিত্বকে বিকাশিত করে তোলার ক্ষেত্রে যে সকল বাধা রয়েছে তা এ দর্শন দূর করে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, নিজেকে শিক্ষিত, সংস্কৃত, অনুশীলিত করে বিকাশিত করে গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে মানুষ মুক্ত হবে। কিন্তু তাঁর এ চাওয়া আজও সফল হয় নি। তিনি ১৯৫২ সালের জুন মাসে সকালে হাটতে গিয়ে পাহাড় থেকে ৫০ ফুট নিচে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। মাসের পর মাস চিকিৎসা চলে। পরে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হন। আবার লেখার কাজে মন দেন। নেহেরু তার সঙ্গে দেখা করেন। এবং রাষ্ট্রপতির তহবিল থেকে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

১৯৫৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারী হঠাৎ তার বুকের ব্যাথ্যা ওঠে। ঐদিন রাত ১১.৩০ তিনি মারা যান। সেদিন এক কিংবদন্তী বিপ্লবীর জীবনাশ ঘটে।

এম এন রায় একাধারে একজন দার্শনিকও ছিলেন। তার জীবনাদর্শন পর্যালোচনা করলে বোঝায় যায়। তিনি কারও দ্বারা জীবনের সংকটময় পরিস্থিতেও প্রভাবিত হন নি। তিনি স্বতস্ত্রভাবে চিন্তা করতেন। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী। কোনো বাধা বিপত্তি তাকে কখনও দমিয়ে রাখতে পারেনি। রায় মানবজীবনকে বিকাশিত করার ক্ষেত্রে দর্শনের এক নতুন দিক উম্মোচন করছেন। যদিও আমাদের দেশে তাঁর সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। আমরা আশা করবো তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর প্রকাশিত বই সমূহ সর্বসাধারণ জানার ও পড়ার সুযোগ পাবে। তাঁর জীবন একমাত্র ব্রত ছিল তা হচ্ছে মানুষের সার্বিক মুক্তি। তাঁর দেশ প্রেম ও বিপ্লবী কর্মপ্রচেষ্টা সমস্ত মানব জাতির কাছে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।

Comments (1)Add Comment
0
...
written by সজ্জন, September 07, 2010
অনেক কিছুই জানা ছিল না, যা জানতে পারলাম.........

Write comment

busy

আরও পড়ুন

  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • 8

হিট পরিসংখ্যান

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterআজকের ভিজিটর সংখ্যা34
mod_vvisit_counterগতকালের ভিজিটর সংখ্যা74
mod_vvisit_counterএই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা578
mod_vvisit_counterগত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা1302
mod_vvisit_counterএই মাসের ভিজিটর সংখ্যা1371
mod_vvisit_counterগত মাসের ভিজিটর সংখ্যা4654
mod_vvisit_counterসর্বমোট ভিজিটর29948

We have: 1 guests online
Your IP: 38.107.191.102
 , 
Today: Sep 09, 2010
এখন পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটের হিট25014