শিল্পী নিতুন কুন্ডু

 

altশিল্পী নিতুন কুন্ডু। অনেকেরই কাছে নিতাই দা। এদেশের সচেতন সকল মানুষ তাকে চিনে, জানে। আজ আর তিনি আমাদের চোখের সামনে নেই। সশরীরে আর আর কোনো দিন আমরা তাকে পাবো না_একথা সত্যি, কিন্তু তিনি এবং তাঁর সৃষ্টি আমাদের মাঝে, আমাদের চেতনায় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরদিন।

দিনাজপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র 'বড়বন্দর' এলাকায় ১৯৩৫ সালের ৩ ডিসেম্বর জন্ম নেন চিত্র শিল্পী নিতুন কুন্ডু৷ বাবা-মা প্রথম নাম রেখেছিলেন শ্রী নিত্য গোপাল কুন্ডু৷ তাঁর মা বীণাপানি কুন্ডু সবসময় ছেলেকে 'নিতুন' নামে ডাকতেন৷ তাই ডাক নামটি এক সময়ে সকলের কাছে প্রতিষ্ঠা পায়৷ তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুন্ডু ছিলেন একজন ধান-চাউলের আড়তদারী ব্যবসায়ী৷ মা বীণা পানি কুন্ডু ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিনী৷

তাঁদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন পাবনার জমিদার৷ তত্‍কালীন জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পরে নিতুন কুন্ডুর ঠাকুর দাদা শ্রী চন্দ্রমোহন কুন্ডু দিনাজপুরে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন৷ সেখানে প্রথমে তিনি আড়তদারী ব্যবসা আরম্ভ করেন৷ শিল্পী নিতুন কুন্ডু তিন ভাই আর চার বোনের মধ্যে ছিলেন তৃতীয় এবং ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়৷ নিতুন কুন্ডুর দু'সন্তান৷ মেয়ে অমিতি কুন্ডু এবং ছেলে অনিমেষ কুন্ডু (আনন্দ)৷ স্ত্রী ফালগুনি কুন্ডু৷

নিতুন কুন্ডুর প্রথম লেখাপড়ায় হাতে খড়ি হয় ১৯৪২ সালে স্থানীয় বড় বন্দর পাঠশালায়৷ যেটি এখন বড়বন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত৷ পাঠশালার পাঠ শেষে ১৯৪৭ সালে তিনি ভর্তি হন দিনাজপুর শহরের মহারাজা গিরিজা নাথ হাইস্কুলে৷ লেখাপড়া এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে তখন স্কুলটির যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি ছিল৷ শিল্পী নিতুন কুন্ডু এই স্কুল থেকেই ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন৷

লেখাপড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকা ছিল তাঁর প্রধান সখ ও নেশা৷ তিনি পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে এই ছবি আঁকার প্রেরণা পেয়েছিলেন৷ তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুন্ডু শখ করে ছবি আঁকতেন৷ তিনি মূলত তাঁর সৃজনশীল মনন থেকে ছবি আঁকতেন৷ ফুটবল খেলা ছিল শিল্পী নিতুন কুন্ডুর খুব প্রিয়৷ দিনাজপুর শহরে অবস্থিত যোগেন বাবুর মাঠে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন খেলাধূলা করতেন৷

আজকের বিখ্যাত অভিনেতা-পরিচালক সুভাষ দত্ত (পটলা) ১৯৫৩ সালের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্রে কাজ করার জন্য বম্বে থেকে ফিরে দিনাজপুরে মামা বাড়ি আসেন এবং সেখানে তিনি ব্যানার, সাইনবোর্ড ইত্যাদি সাজ সজ্জার কাজ শুরু করেন৷ তখন নিতুন কুন্ডু শিল্পানুরাগী সুভাষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ এক পর্যায়ে সুভাষ দত্ত নিতুন কুন্ডুর সুন্দর হাতের লেখার জন্য সিনেমা হলের ডেকোরেশন, ব্যানার ও সাইন বোর্ড লেখার সহকারী হিসেবে সঙ্গে নেন৷ নিতুন কুন্ডু অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন৷ সুভাষ দত্তের কাজ দেখে ঢাকার এক ফিল্ম রিপ্রেজেনটেটিভ তাঁকে মাসে ১০০ টাকা বেতনে ঢাকায় আসার সুযোগ করে দেন৷ এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন৷

১৯৫৩ সালের শেষের দিকে নিতুন কুন্ডুও ঢাকায় আসেন এবং ১৯৫৪ সালে তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হন৷ তখন উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক একই সাথে আর্ট কলেজে পড়ানো হতো৷ আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তিনি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান৷ খেয়ে না খেয়ে সিনেমার পোষ্টার আঁকতেন, প্রতি বর্গফুট মাত্র ১ আনা৷ সারা রাত ধরে ব্যানার এঁকে সকালে আর্ট কলেজে ক্লাস করতে যেতেন৷ ক্লাস করা, ক্লাসের অতিরিক্ত কাজ করা, সে এক অন্য রকম কষ্টের জীবন৷ একদিকে আর্থিক দৈন্যতা অন্যদিকে সৌন্দর্য্য চর্চা৷ এভাবে কঠোর সাধনার মধ্যে দিয়ে এগুতে থাকেন তিনি৷

চতুর্থ বর্ষে ড্রইং করতে হতো মডেল সামনে বসিয়ে৷ আর্ট কলেজের দারোয়ান মজিদ ছিল খুব সুঠাম দেহী৷ ময়মনসিংহে বাড়ি৷ শোনা যায়, সে নাকি ডাকাত ছিল৷ জয়নুল আবেদিন তাঁকে আর্ট কলেজে চাকরি দেন৷ এরপর সে ডাকাতি করা ছেড়ে দিয়েছিলো৷ এই মজিদের পুরো ফিগার বেশ বড় আকারে সাদা-কালোতে এঁকেছিলেন তিনি৷ নিতুন কুন্ডুর এই কাজটি খুব প্রশংসিত হয়েছিল৷ বার্ষিক প্রদর্শনীতে এ কাজটির জন্য নিতুন কুন্ডু পুরষকৃত হয়েছিলেন৷

শিল্পী নিতুন কুন্ডু ছিলেন আর্ট কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্র৷ শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রী সকলের কাছে অসম্ভব প্রিয় ছিলেন তিনি৷ ড্রইংয়ে তুখোড়, জলরঙে সাবলীল, আর তেলরঙে ছিল মুন্সিআনা৷ কম্পোজিশন নামাতে পারতেন- যে কোনো মাধ্যমে৷ জীবন ঘনিষ্ঠ যেকোন চিন্তাভাবনাকে তিনি তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন অনায়াসে৷ এছাড়া গ্রাম-বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা প্রকৃতি ও নিঃসর্গ প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অসামান্য দক্ষতার ছাপ৷ তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছেন ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে৷

১৯৫৯ সালে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পেইন্টিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন শিল্পী নিতুন কুন্ডু৷ তাঁর প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেবেন, কিন্তু সেই ইচ্ছে তাঁর পূরণ হয়নি৷ কেননা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ তা চাননি, একজন সংখ্যালঘুর উচ্চাশা বাস্তবে রূপ নিক৷

ষাট, সত্তরের দশকে ঢাকার মার্কিন তথ্যকেন্দ্র 'ইউসিস' নামে পরিচিত ছিল৷ যা এখন আমেরিকান কালচারাল সেন্টার নামে পরিচিত৷ এই ইউসিসে তিনি ১১ বছর অর্থাত্‍ ১৯৫৯-১৯৭১ সাল পর্যন্ত কাজ করেন৷ তিনি যখন ১৯৭১ সালে ইউসিসের চাকরি ইস্তফা দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে প্রবাসী সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে যোগদান করেন, তখন ইউসিসে তাঁর সর্বশেষ পদমর্যাদা ছিল চীফ ডিজাইনার৷

ইউসিসের এই চাকরিতে নিতুন কুন্ডু তাঁর সৃজনশীলতার অপূর্ব স্বাক্ষর রেখেছিলেন৷ বিশেষ করে আমেরিকার নীল আর্মস্ট্রং ও তাঁর সহযোগিরা যখন চাঁদের পাথর নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসেন তখন তোপখানা রোডে ইউসিস ভবনে চাঁদ ও মহাশূন্য নিয়ে শিল্পী নিতুন কুন্ডুর স্থাপনা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল৷ পরবর্তী সময়ে তিনি ইউসিসের প্রধান শিল্পী হয়েছিলেন৷

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা উত্তর সময়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নানাবিধ প্রকাশনায় তিনি তাঁর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন৷ ষাট দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে বড় বড় নানা শিল্প শোভন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার প্রায় সব মিছিলেই শোভা পেত৷ এর বেশিরভাগই থাকতো নিতুন কুন্ডুর আঁকা৷ পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ মিনারকে ঘিরে যে সাজসজ্জা হতো সেখানেও নিতুন কুন্ডুকে দেখা যেত অগ্রণী ভূমিকায়৷ অবশ্য আরো অনেকে তখন শহীদ মিনার সজ্জার কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন৷

নিতুন কুন্ডু ছিলেন যথার্থই একজন 'ভার্সেটাইল' (Versatile) শিল্পী৷ বাণিজ্যিক পোষ্টার থেকে নান্দনিক পেইন্টিং- সব শাখাতেই তিনি ছিলেন পারদর্শী৷ ইস্কাটনের দিলু রোডের বাসায় থাকতেই তিনি মধুমিতা সিনেমা হলের ম্যুরালের কাজ করেন৷ ১৯৬৬-৬৭ সালে মধুমিতা সিনেমা হল তৈরি হয়৷ হলের লবিতে নিতুন কুন্ডু ম্যুরাল করেছেন সেগুন কাঠ দিয়ে৷

নিতুন কুন্ডুর একটি নিয়মিত কাজ ছিল বিভিন্ন শিল্পমেলায় প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করা৷ বিশেষ করে প্রতিবছর টেঙ্টাইল মিল কর্পোরেশনের প্যাভিলিয়ন নির্মাণ ছিল তাঁর বাঁধা৷ সারারাত জেগে কাজ করে তিনি একটি শৈল্পিক প্যাভিলিয়ন উপহার দিতেন৷ তাঁর প্যাভিলিয়নই প্রতি বছর সেরা প্যাভিলিয়নের পুরষ্কার অর্জন করতো৷ সেই ষাটের দশক থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত নিতুন কুন্ডু কখনো অন্যের, কখনো নিজের প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়ন তৈরি করেছেন৷ এবং শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার অর্জন করেছেন৷ পরে মেলা কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেলার মূল পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন৷

শিল্পী নিতুন কুন্ডু ১৯৬৪, ১৯৬৬, ১৯৬৭, ১৯৬৮ সালে পরপর প্রদর্শনী করেছেন৷ জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৬৫ সালে৷ এসব প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ছাড়াও প্রদর্শিত হয়েছে সিল্ক, স্ক্রিনপ্রিন্ট, এনটিক প্রিন্ট, ভাস্কর্য, ড্রইং ইত্যাদি৷ পেইন্টিং বিভাগের ছাত্র হয়ে গ্রাফিঙ্ ডিজাইনেও অসামান্য দক্ষতা ছিল তাঁর৷ জীবন যাপনে সব সময় একেবারে সাধাসিধে ছিলেন আজীবন৷ ব্যক্তি জীবনে ধর্মীয় গোড়ামী তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি৷

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষ নিলে নিতুন কুন্ডু ইউসিসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে যান৷ যাত্রাকালে বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে রোহিতপুরে শিল্পী ইমদাদ হোসেন এর বাড়িতে থাকেন কিছুদিন৷ এরপর নদীপথে তাদের ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়৷ এ সময় তাঁকে অনেক দুর্ভোগ ও বিপদের মধ্য দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল৷ ভারতে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর ভক্সওয়াগন গাড়িটি একজন ঘনিষ্ঠজনের নিকট দিয়ে যান, বলেছিলেন যদি মুক্তিযুদ্ধের কোনো কাজে লাগে৷ স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে এসে তিনি আর অক্ষত অবস্থায় গাড়িটি ফেরত পাননি৷ কলকাতা গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে কাজ করেন পটুয়া কামরুল হাসানের সঙ্গে৷

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিতুন কুন্ডু শিল্পী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন৷ তাঁর আঁকা দুটি পোস্টার মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে৷ এখনো সেই পোষ্টারদুটি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে৷ তাঁর আঁকা পোষ্টারদুটি হলো- একটি এক টগবগে যুবক, দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেল কাঁধে, চোখে মুখে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার দৃঢ় সংকল্প; অপরটি একজন নারীর, স্নেহশীলা, মমতাময়ী কিন্তু মুক্তির স্বপ্নে বিভোর৷ এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলার মানুষকে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যাওয়ার জন্যে প্রেরণা দিয়ে এবং শক্তি সাহস দিয়ে অনেক পোস্টার ও ফেস্টুন আঁকেন তিনি৷ যেগুলো ছিল সে সময় মুক্তিযুদ্ধের এক ধরনের বিশেষ অস্ত্র৷ তাঁর আঁকা একটি পোষ্টারের বক্তব্য হলো- 'বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলমান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীষ্টান- আমরা সবাই বাঙালি'৷ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল৷

১৬ ডিসেম্বর '৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই শিল্পী নিতুন কুন্ডু অন্য সবার মতো আবার ঢাকা ফিরে আসেন৷ তবে মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন বিরোধিতার কারণে নিতুন কুন্ডু পুনরায় আর মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে যোগ দেননি৷ তিনি তখন স্বাধীনভাবে কাজ করার চিন্তা ভাবনা শুরু করেন৷

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় নিতুন কুন্ডুর পরিবার দেশ থেকে বিতাড়িত এক কোটি শরণার্থীর মতো ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল৷ ঐ সময় নিতুন কুন্ডুর মা বীণাপানি কুন্ডু হাওড়াতে ফাল্গুনিকে দেখে ফাল্গুনির বাবা-মা'র কাছে তাঁর ছেলের স্ত্রী করার প্রস্তাব দেন৷ ভারতে থাকাকালীন বিয়ের পাকা কথা হয়৷ এরপর দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ৪ আগস্ট কলকাতার হাওড়াতে ফাল্গুনির বাবার বাসায় তাঁদের বিয়ে হয়৷

নিতুন কুন্ডু নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে নারীর শিক্ষা, সচেতনতা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর সর্বদা জোর দিতেন৷ এজন্যে তিনি বেশ কিছু নারী সংগঠনকে বড় বড় অংকের অনুদানও দিয়েছেন৷ নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন৷ তার মধ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ একটি৷ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উন্নয়নে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আর্থিক, মানবিক ও পরামর্শগত সহযোগিতা করেছেন৷ বিভিন্ন নারী সংগঠনকে তিনি অটবি প্রতিষ্ঠার পর নিয়মিতভাবে আর্থিক সাহায্য করেছেন৷

সমাজ সেবার নানা ক্ষেত্রে নিতুন কুন্ডু সকলের অগোচরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন৷ কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছে একবার পৌঁছাতে পারলে সে খালি হাতে কখনো ফেরেনি৷ ঢাকা, দিনাজপুর, মানিকগঞ্জসহ দেশের অধিকাংশ রামকৃষ্ণ আশ্রমে তিনি আর্থিক সহযোগিতা করেছেন৷ ঢাকার বারডেম হাসপাতল, কিডনি ফাউন্ডেশন, শিশু হাসপাতাল-এর মতো অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও শিল্পী নিতুন কুন্ডু অনেক বড় ধরনের সহযোগিতা করেছেন৷ ঢাকা, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সংগঠন সংস্কার ও নির্মাণে, উত্‍সব পার্বণে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন৷ অনেক এতিম ও দুস্থ ছেলেমেয়েকে তিনি সহযোগিতা করেছেন৷

শিল্পী নিতুন কুন্ডু শুধু ছবি এঁকেই সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না৷ তাঁর চিন্তার মধ্যে সর্বদা খেলা করতে থাকা সৃষ্টিশীলতার আরেক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ভাস্কর্যকে৷ তাঁর তিনটি বিখ্যাত ভাস্কর্য এখন দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও আলোচিত৷ ঢাকায় সোনারগাঁও হোটেলের মোড়ে 'সার্ক ফোয়ারা', রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সাবাস বাংলাদেশ' আর চট্টগ্রামে বিমানবন্দরের প্রবেশ মুখে 'সাম্পান'৷ তিনি যদিও ফাইন আর্টস-এর ছাত্র ছিলেন, তথাপি তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা ও অন্যান্য বিষয়গুলিও ভাল বুঝতেন৷

১৯৫৫-১৯৫৯ সাল পর্যন্ত চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে শিল্পী নিতুন কুন্ডু দেশের সবগুলো যৌথ চিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন৷ এছাড়া ১৯৬২ সালে ঢাকার জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে যৌথ প্রদর্শনী ও ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীদের যৌথ প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন৷ ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রামে সমকালীন শিল্পীদের যৌথ প্রদর্শনী এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকার জাতীয় চারুকলায় যৌথ প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন৷

ঢাকায় ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে ও ১৯৬৬ সালে ইউএস তথ্যকেন্দ্রে, ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রামের ইউএস তথ্যকেন্দ্রে ও ১৯৫৮ সালে রাজশাহীর ইউএস তথ্যকেন্দ্রে তাঁর একক প্রদর্শনী হয়৷ এছাড়াও দেশে ও দেশের বাইরে তাঁর অনেক যৌথ ও একক প্রদর্শনী হয়৷

ছাত্র জীবনে বিভিন্ন মাধ্যমে মৌলিক ও জীবন্ত শিল্পকর্মের জন্যে ১৯৫৪-১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় চিত্রকলা পুরস্কার অর্জন করেছেন৷ ১৯৬৫ সালে তিনি জাতীয় চিত্রকলা পুরস্কার অর্জন করেছেন৷ ১৯৫৮ সালে তিনি ভ্রাম্যমান প্রদর্শনী/চিত্রকলায় স্বর্ণপদক পান৷ ১৯৭৪, ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে ঢাকায় বাণিজ্য মেলার প্যাভিলিয়ন ডিজাইনের জন্য তাঁকে প্রথম পুরস্কার প্রদান করা হয়৷

১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান- 'দি ডিজাইনার্স'-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল৷ তখন তিনি সেই ছোট্ট পরিসর থেকে সূচনা করেন তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়৷ ১৯৭৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম বদল করে নতুন নাম দেয়া হলো 'আর্ট ইন ক্র্যাফট'

'আর্ট ইন ক্র্যাফট' সে সময় 'জাতীয় চলচ্চিত্র পদক' তৈরির মতো একটা বড় কাজের অর্ডার পেয়েছিল৷ অনেক টাকার কাজ ছিল সেটি৷ তখন আর্ট ইন ক্র্যাফট-এ নানারকম মেডেল, ক্রেস্ট, কোটপিন, ট্রফি এবং প্লাক তৈরি হতো৷ নিতুন কুন্ডুর শখ ছিল মেটালের উপর কাজ করার৷

বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহার করতো কাঠের ফার্ণিচার৷ কিন্তু বাস্তবিক অর্থে দেশে দিনে দিনে কাঠের উত্‍সের পরিমাণ সীমিত হয়ে পড়ে৷ এ কারণে শিল্পী নিতুন কুন্ডু কাঠের বিকল্প হিসেবে মেটাল ফার্ণিচারের কথা প্রথম চিন্তা করেন৷ এরপর ১৯৭৮ সালে ঢাকার ২৩০নং নিউ এ্যালিফ্যান্ট রোডে একটি মেটাল ফার্ণিচারের শো-রুম প্রতিষ্ঠা করেন৷ সেখান থেকে ওইসব মেটাল ফার্ণিচারের যথাযথ বিপনন কার্যক্রম আরম্ভ হয়৷

প্রতিষ্ঠানটি ভালোভাবে চালু হয়ে যাওয়ার পরই নিতুন কুন্ডু 'অটবি' গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকেন৷ অটবি অর্থ অরণ্য৷ অটবির লগো তিনি নিজেই করলেন৷ আর এভাবেই ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু হয় অটবি নামের নতুন এক আসবাব শিল্প প্রতিষ্ঠানের৷ তারপর তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেকগুলো দেশ ভ্রমণ করে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক ফার্ণিচার উত্‍পাদন শুরু করেন৷ সেক্ষেত্রে তিনি বেশি জোর দিয়েছিলেন ক্রেতার চাহিদা ও রুচিবোধের ওপর৷ যার ফলে তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্য লাভে সক্ষম হন৷

অটবি স্টীলের টেবিল ল্যাম্প তৈরির মাধ্যমে তার কাজের সূচনা করেছিল৷ মাটি আর কাঠের নানা পণ্যের সঙ্গে তখন অটবিতে তৈরি করা হতো কোটপিন, ক্রেস্ট, ট্রফি, ঘর সাজানোর নানা সরঞ্জাম ও ধাবত আসবাবপত্র৷ সেই সময় নিতুন কুন্ডু প্রচুর কাজ করেছেন, কাউকেই কোনো কাজে না করেননি৷ আশি আর নব্বইয়ের দশকে প্রায় প্রতিটি জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ট্রফি বা কাপ তৈরি করেছেন নিজ হাতে৷ শিল্পী নিতুন কুন্ডু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে সব সময় সচেতন ছিলেন৷ তাঁর হাত দিয়েই আমাদের দেশে আধুনিক রীতির ধাতব ঢালাই করা ক্রেস্ট, পদক এসবের প্রচলন শুরু হয়েছিল৷ তাঁর এ জাতীয় কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জাতীয় চলচ্চিত্র পদক, প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, একুশে পদক, নতুন কুঁড়ি পদক, শিল্প মেলা ট্রফি প্রভৃতি৷

'অটবি' শিল্পী নিতুন কুন্ডুর বহু চিন্তা ভাবনার ফসল৷ অটবি শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, এটা বাংলাদেশের ফার্ণিচার শিল্পে এক অনন্য বিপ্লব৷ যা ফার্ণিচার সম্পর্কে মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তন ঘটিয়েছে৷ অটবির তৈরি পণ্যসামগ্রী অন্যদের তুলনায় উন্নতমানের বিধায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ১৯৮১-২০০১ সাল পর্যন্ত এককভাবে এই প্রতিষ্ঠান প্রথম পুরস্কার লাভ করে৷

শিল্পী নিতুন কুন্ডুকে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে স্পীস দেয়ার জন্যে ডেকে নেওয়া হতো৷ তাছাড়া এখন অটবিতে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির অনেক ছাত্ররা ইন্টার্নশিপ করছে এবং ইতিপূর্বে অনেকে করেছে৷ এই হিসেবে বলা যায় অটবি একটি ইনস্টিটিউশন৷ সর্বপ্রথম অটবিতে ইন্টার্নশিপ করতে আসেন বর্তমান অটবির কর্মকর্তা সুরজিত্‍ রায় চৌধুরী৷ শিল্পী নিতুন কুন্ডু দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তিলে তিলে নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে অটবিকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন৷ সেই সাথে প্রতিষ্ঠা করেছেন অটবির সুনাম ও সম্মান৷

শিল্পী নিতুন কুন্ডু তাঁর জীবনে প্রথম গুরুতর অসুস্থ হন ১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর৷ তখন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি অনেকদিন কর্মস্থল ছেড়ে বিছানায় ছিলেন৷ যদিও ঐ অবস্থায়ও তিনি সকল ফ্যাক্টরী এবং কর্মকান্ডের খবর নিয়েছেন৷ '৯৬ সালে তাঁর জন্ডিস দেখা দেয়৷ ২০০৪ সাল থেকে কিডনি ও হাঁটুর ব্যথা দেখা দেয়৷

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ এরপর তাঁকে দ্রুত শ্যামপুর ফ্যাক্টরী থেকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়৷ চিকিত্‍সকদের অবিরাম চেষ্টার ফলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে৷ ১৩ তারিখে আবারও স্বাস্থ্যের অবনতি হয় এবং ১৫ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন৷

Comments (0)Add Comment

Write comment

busy

আরও পড়ুন

  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • 8

হিট পরিসংখ্যান

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterআজকের ভিজিটর সংখ্যা72
mod_vvisit_counterগতকালের ভিজিটর সংখ্যা272
mod_vvisit_counterএই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা72
mod_vvisit_counterগত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা1302
mod_vvisit_counterএই মাসের ভিজিটর সংখ্যা865
mod_vvisit_counterগত মাসের ভিজিটর সংখ্যা4654
mod_vvisit_counterসর্বমোট ভিজিটর29442

We have: 2 guests, 1 members, 1 bots online
Your IP: 38.107.191.101
 , 
Today: Sep 05, 2010
এখন পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটের হিট24626