সরদার ফজলুল করিম

altস্কুলে পড়ার বয়সে প্রায় রাতেই ঘুম হতো না কিশোর ছেলেটার৷ বই বগলে নিয়ে হোস্টেলের দেয়াল টপকে চলে যেতেন বরিশালের জাহাজঘাটে৷ সেখানে রাস্তার ল্যাম্পের আলোয় বসে পড়তেন রাজ্যের সব বই৷ ছাত্র হিসেবেও ছিলেন বেশ ভালো৷ ক্লাশ নাইনে পড়ার সময় তাঁর বন্ধু মোজাম্মেল হক তাঁকে এক রাতের মধ্যে পথের দাবী পড়ে শেষ করতে দেন৷ শরত্‍চন্দ্রের লেখা এই বইটি তাঁর ভাবনার জগত্‍ পুরোপুরি বদলে দেয়৷ পরবর্তী জীবনে তিনি বলেন, পশ্চিম বঙ্গের বর্ষীয়ান বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মতো তিনিও রাজনীতিতে এসেছিলেন এই বইটি পড়ে৷ এখান থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বিল্পবী চেতনায়৷ জেল খেটেছেন, শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-অনশন করেছেন আবার ছাত্রদের মাঝে দর্শনের জ্ঞান বিতরণ করেছেন, লেখালেখি তো আছেই৷

জ্ঞান-পিপাসু বিপ্লবী এই শিক্ষাবিদ আমাদের অতি শ্রদ্ধেয় সরদার ফজলুল করিম৷ তাঁর জীবনের প্রতিটা অধ্যায়ই বৈচিত্রে ভরপুর৷ যখন যা মনে হয়েছে তখন তিনি সেভাবেই চলেছেন, মনে লালিত আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেননি বরং প্রতিনিয়ত তাকে আরো দৃঢ় করেছেন৷ বৈপ্লবিক আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন, দীর্ঘ চার দফায় মোট ১১ বছর জেল খেটেছেন৷ তবুও জীবন নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ কিংবা অপ্রাপ্তি নেই বরং মনে করেন, তাঁর জীবনের পুরোটাই লাভ!

সরদার ফজলুল করিমের জন্ম ১৯২৫ সালের মে মাসে৷ বরিশাল জেলার উজিতপুর থানার আটিপাড়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে৷ বাবা খবিরউদ্দিন সরদার কৃষিকাজ করতেন৷ মা সফুরা বেগম ছিলেন গৃহিণী৷ তাঁরা দুই ভাই তিন বোন৷ সরদার ফজলুল করিমের শৈশবকাল কেটেছে গ্রামে৷ ছেলেবেলায় বড় ভাইয়ের ঘাড়ে চড়ে তাঁর কর্মস্থলে যাওয়ার বায়না ধরতেন৷ ফজলুল করিমের পীড়াপীড়িতে তিনি মাথায় করে তাঁকে কর্মস্থল নাজিরপুরে নিয়ে যান৷

বর্ণ পরিচয়ের পর থেকে তিনি গড়গড় করে বাংলা পড়তেন৷ তাঁর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় মামাবাড়ি আটিপাড়া গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ তখন শিক্ষক বাঁশের কলম কালিতে চুবিয়ে সিদ্ধ তালপাতায় বর্ণ লিখে দিতেন৷ সেটাই তিনি দেখে দেখে পড়তেন৷ আর সবাই মিলে সুর করে নামতা পড়তেন৷ এরপর ১৯৩৫ সালে রহমতপুর বয়েজ হাইস্কুলে সরদার ফজলুল করিম চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন৷ বড় বোন মেহেরুন্নেসা ও তিনি এক স্কুলে এক ক্লাসে পড়তেন৷ থাকতেন বড় ভাইয়ের কোয়ার্টারে৷ রহমতপুরের আইনজীবী ওহাব খানের বাড়িটাকে সরকার সাব রেজিস্ট্রারি অফিস হিসেবে ব্যবহার করে৷ নিচতলায় অফিস আর দোতলায় ছিল সাব রেজিস্ট্রারের কোয়ার্টার৷ প্রতিদিন দুই ভাইবোন কোয়ার্টার থেকে মাইলখানেক পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন৷ সরদার ফজলুল করিম গণিত ভালো পারতেন না৷

১৯৪০ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকায় চলে আসেন৷ ভর্তি হন ঢাকা কলেজে৷ থাকতেন কলেজের হোস্টেলে৷ উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন৷ এরপর ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজি বিভাগে বিএ অনার্স ভর্তি হন ৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন তিনি ইংরেজি বিভাগে থাকলেন৷ ঘুরে ঘুরে শিক্ষকদের বক্তৃতা শুনতেন৷ কোন শিক্ষক কিভাবে বক্তৃতা দেন তা দেখলেন৷ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন৷ তিনি সব ক্লাশের পাশ দিয়ে ঘুরতেন৷ করিডোর দিয়ে যাবার সময় এপাশে-ওপাশের বিভিন্ন ক্লাশ দেখতেন৷ দর্শনের হরিদাস ভট্টাচার্য্যের বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে যেতেন৷ তাঁর বক্তৃতা সরদারকে আকৃষ্ট করে৷ তিনি 'সত্য' এবং 'মিথ্যা' কি, এ নিয়ে একদিন আলোচনা করছিলেন৷ সরদার ফজলুল করিম কাছে গিয়ে বললেন, 'স্যার, আমি দর্শনে ভর্তি হব৷' চলে এলেন দর্শন বিভাগে৷ তিনি দর্শনের বাইরে অন্য ক্লাসও করতেন৷ আব্দুল হাদী তালুকদার ছিলেন দর্শনের শিক্ষক৷ তাঁর ইংরেজি বক্তৃতা তিনি বাংলায় অনুবাদ করে দিতেন৷ ১৯৪৫ সালে সরদার ফজলুল করিম দর্শনশাস্ত্রে বিএ অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন৷ ১৯৪৬ সালে এম.এ তে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন৷ রাজনীতির কারণে তিনি লন্ডনের স্কলারশীপ প্রত্যাখ্যান করেন৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এস এন রায়ের ভাই বিনয় রায় ছিলেন দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান৷ সরদার ফজলুল করিমের এম.. পরীক্ষার ফল বেরুতেই বিনয় রায় তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতে বললেন৷ তিনি পরদিন থেকে অর্থাত্‍ ১৯৪৬ সালে লেকচারার হিসেবে ক্লাস নিতে শুরু করেন৷ ১৯৪৮ সালে রাজনীতির কারণে স্বেচ্ছামূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ইস্তফা দেন তিনি৷ ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমীর অনুবাদ শাখায় যোগ দেন৷ ১৯৭১ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি শাখার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন৷ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন৷ কারাগারে থেকে পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি৷

ছাত্রাবস্থায়ই সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে৷ ১৯৩৯-৪০ সালে স্কুলে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিল শতকরা ৫ থেকে ১০ জন৷ হিন্দু কিশোর বন্ধুদের মধ্যে তিনি বৃটিশ-বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের আভাস পান৷ তখন তিনি বরিশাল জেলা স্কুলের নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র৷ সহপাঠী মোজাম্মেল হক মুসলমান হলেও একটু ভিন্ন ধরণের ছিলেন৷ তিনি তাঁকে পড়তে দিলেন 'প্রেসক্রাইবড', 'পথের দাবী'৷ এরপর দিলেন লাল অক্ষরে মুদ্রিত বিপ্লবী ইশতেহার, স্বাধীনতা এবং সমাজতন্ত্রের ইশতেহার৷ তিনি গোপনে তাঁকে জানান তিনি যোগ দিয়েছেন বেআইনি গুপ্তদলে৷ সে দলের নাম বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল: আর.এস.পি৷ মোজাম্মেল তাঁকে সাবধান করে দেন, কেউ যেন কথাটি না জানে৷ কেউ যেন টের না পায়৷

১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র রবি গুহের সাথে তিনি নেত্রকোণা কৃষক সম্মেলন দেখতে যান৷ তিনি দেখেন দূর দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে কৃষক প্রতিনিধির দল এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে৷ পাহাড়ি এলাকা থেকে এসেছে হাজং কৃষকের দল৷ তাদের মাঝেই মাঠের এককোণে জায়গা করে নেন সরদার ফজলুল করিম৷ মঞ্চে একে একে নেতারা বক্তৃতা দেন৷ এই মঞ্চে মণি সিংহ বক্তৃতা দেন৷ মণি সিং এর নাম ঘোষণার সাথে সাথে হাজং কৃষকরা সকলে সোজা হয়ে বসে৷ কেউ মন লাগাতে দেরি করছে দেখতে পাওয়া মাত্রই অন্যরা ধমক দিয়ে বলে উঠে- "শোন শোন আমাদের মণি বেটা বলছে৷ কৃষকদের এই কথাটি তাঁর মনকে শিহরিত করে দেয়৷ ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি আত্মগোপনরত কমিউনিস্ট পার্টির কাজে মনোনিবেশ করেন৷

আণ্ডারগ্রাউণ্ডে থেকে কাজ চালিয়ে যান তিনি৷ পুলিশ তাঁকে খুঁজছে৷ দিনের বেলা বের হন না৷ রাতের অন্ধকারে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সাক্ষাত্‍ করেন৷ রাজনীতির অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন৷ সংগঠনের সিদ্ধান্ত ও ডাককে পোস্টারে লিখে সেই পোষ্টার শহরের দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়ে দেন৷ পূর্ব বাংলার সরকার বুঝতে পারে আন্দোলনরত রাজনীতির মূলে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি৷ সে পার্টি বেআইনি না হলেও তাঁর প্রকাশ্যে চলাফেরা অসম্ভব করে দেয় সরকারি পুলিশ৷ ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে জিন্নাহ্র ঢাকা আগমন এবং তাঁর উক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের পর সরকারি এই আক্রমণ অধিকতর তীব্র হয়৷ উপযুক্ত আশ্রয় ও খাবারের অভাবে তাঁর শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে৷ ঢাকা বা পূর্ববঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বন্ধুদের পরামর্শে তিনি কলকাতায় চলে যান৷ কিন্তু কলকাতাতেও কমিউনিস্টদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে৷ তাঁর ভরসা ছিল তিনি পূর্ববঙ্গের কর্মী, সুতরাং সেখানে তাঁকে কেউ চেনে না৷ আর সেখানে তাঁকে হয়রানি কেনইবা করবে? এই ভরসাতে তিনি উত্তরবঙ্গ ঘুরে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতা পৌঁছেন৷ কলকাতায় যে বন্ধুর বাড়িতে যান, সেখানে খাওয়ার যদিওবা বন্দোবস্ত হয়, থাকার সমস্যা দেখা দেয়৷ একটি বাড়িতে তাঁরা অসংখ্য লোক বসবাস করতেন৷ ফলে তিনি অন্যত্র আশ্রয়ের খোঁজ করেন৷ 'ইত্তেহাদ' পত্রিকায় সাহিত্য বিভাগের পরিচালক ছিলেন আহসান হাবীব৷ পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরেই তিনি আহসান হাবীবের সঙ্গে দেখা করে রাতে তাঁর আশ্রয়ে থাকার কথা বলেন৷ আহসান হাবীব তাঁকে বলেন, "তোমার শরীর খারাপ হয়েছে৷ তুমি সংগ্রামী আদর্শে অনুপ্রাণিত৷ তোমাকে ওপথ থেকে ফেরাবার ক্ষমতা আমার নেই৷ কিন্তু তুমি আমার বাসায় কয়েকদিন থাকবে৷ এটুকু আমি করতে না পারলে, আমারও তাতে দুঃখ কম হবে না৷

সরদার ফজলুল করিম আহসান হাবীবের দক্ষিণ কলকাতার পার্ক এভিনিউর ভাড়া করা দোতলা বাড়িতে ওঠেন৷ কলকাতায় সরদার ফজলুল করিমের কোনো রাজনৈতিক কাজ না থাকায় সারাদিন ঘুরে বেড়ান৷ কখনো চৌরঙ্গীর চৌমাথায় দাঁড়িয়ে রেলিং-এ ভর করে চলমান জনতাকে দেখেন৷ কখনো কলেজ স্কোয়ারের ফুটপাথে বইয়ের দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটেন৷

একদিন রাত দুটো কিংবা তিনটের দিকে হঠাত্‍ আহসান হাবীবের দরজায় অস্বাভাবিক আঘাত পড়ে৷ সরদার ফজলুল করিমের এ শব্দের তাত্‍পর্য বুঝতে দেরি হয়নি৷ বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে আগন্তুকরা রূঢ় গলায় বলে, "আমরা পুলিশের লোক, দরজা খুলুন৷

সরদার ফজলুল করিম বুঝলেন, এবার আর এড়াতে পারলেন না৷ তাঁর হাতে কিছু রাজনৈতিক কাগজপত্র ছিল৷ সেগুলো সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেও বিপদ এড়ানো যাবে না৷ আহসান হাবীব তাঁকে ভেতরের ঘরে দিয়ে সামনের ঘরে গিয়ে দরজা খুলে দেন৷ স্পেশাল ব্রাঞ্চের বাহিনী ঘরে ঢুকে পড়ে৷ সরদার ফজলুল করিম ভেতর ঘর থেকেই শুনতে পান, পুলিশের ইন্সপেক্টর বলছেন, "আমরা খবর পেয়েছি, আপনার এখানে পলাতক রাজনৈতিক নেতা আছে৷ পলিটিক্যাল এ্যাবস্কনডার আছে৷

আহসান হাবীব সঙ্গে সঙ্গে তাদের এই বক্তব্যকে অস্বীকার করলেন৷ পুলিশ জেরা শুরু করতেই তিনি স্ত্রী ও একজন অতিথির কথা জানান৷ পুলিশ ইন্সপেক্টর অতিথিকে দেখতে চাইতেই সরদার ফজলুল করিম পুলিশের সামনে হাজির হন৷ পুলিশ একটু অবাক হয়ে জেরা শুরু করে৷ আপনার নাম কি?

আমার নাম ফজলুল করিম৷

আপনার বাড়ি কোথায়?

আমার বাড়ি বরিশাল৷

আপনি কি করেন?

আমি কলেজে পড়ি৷

কোন কলেজে?

চাখার কলেজে৷

কি পড়েন?

আই এ পড়ি৷

এখানে কেন এসেছেন?

বেড়াতে এসেছি৷

এরপর তাঁর আপাদমস্তক আর একবার নিরীক্ষণ করে হতাশার সুরে বলেন, "না৷ এ নয়৷ হি মাস্ট বি সামবডি এলস৷ কোনো এক সরদার৷ পূর্ববঙ্গের বড় কমিউনিস্ট নেতা, ঢাকার৷ ঢাকা থেকে এসেছে৷ সে খবরই আমরা পেয়েছি৷ এ লোক নয়৷ এ বলে ঘরের ভেতরটা আরেকটু দেখে ইন্সপেক্টর দলবল নিয়ে চলে যান৷ পরের রাতেই সরদার ফজলুল করিম কলকাতা ছেড়ে ঢাকার পথে যাত্রা করেন৷ এরপর ঢাকায় ফিরে এসে কিছুকাল ঢাকার গ্রামাঞ্চলে, কৃষকদের মধ্যে, ঢাকার চালাক চর, পোড়াদিয়া, সাগরদি, হাতিরদিয়া অঞ্চলে আত্মগোপনে থাকেন৷

১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে ঢাকা জেলে রাজবন্দিরা ৪০ দিন ব্যাপী অনশন ধর্মঘট শুরু করেছেন৷ সরদার ফজলুল করিম তখনও গ্রেফতার হননি৷ এ অনশনের খবর পাওয়ার ভিত্তিতে কর্মীরা দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার দেওয়ার চেষ্টা করে৷ সেসময় দেওয়ালে পোস্টার লাগানো ছিল বিপজ্জনক৷ তরুণ কর্মীরা রাতের আঁধারে দেওয়ালে পোস্টার লাগাবার চেষ্টা করত৷ তা লাগাতে গিয়ে অনেক ছাত্র ও তরুণ কর্মী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন৷ এদের মধ্যে ছিলেন আলমুতী, কিশোর আলী আকসাদ প্রমুখ৷

৪০ দিনের অনশনে রাজবন্দিরা কোনো দাবি আদায় করতে পারেননি৷ জেল কর্তৃপক্ষ এবং মুসলিম লীগের কোনো কোনো নেতার প্রতিশ্রুতিতে সে অনশন তাঁরা প্রত্যাহার করেন৷ কিন্তু তাঁদের উপর নির্যাতনের আদৌ কোনো উপশম না হওয়ায় ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকা জেলের রাজবন্দিরা আবার অনশন ধর্মঘট শুরু করেন৷ ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা শহরের তাঁতী বাজার থেকে সরদার ফজলুল করিম তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন৷ তিনি যখন কারাগারে যান তখন রাজবন্দি হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে রাজবন্দিদের অনশন ধর্মঘট চলছিল পুরোদমে এবং কারাগারে ঢুকে সাথীদের সঙ্গে তিনিও অনশনে যোগ দেন রাজবন্দি হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে৷

অনশনের প্রথম ছ'দিন 'সেলের' মধ্যে দিনরাত মেঝেতে চোখ বুজে শুয়ে থাকতেন৷ মাথার কাছে জেলের সিপাহী জমাদার সকাল বিকাল ভাত-তরকারি থালায় করে রেখে যায় তাঁর সামনে৷ কিন্তু তিনি সেগুলি ছুঁতেন না৷ শুধু মাঝে মধ্যে কেবল সামান্য লবন মিশিয়ে পানি খেতেন৷ ছ'দিন পর সরদার ফজলুল করিম স্বেচ্ছায় অনশন না ভাঙ্গার কারণে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয় এবং তাঁকে অন্যান্য অনশনরতবন্দিদের সঙ্গে জবরদস্তি করে খাওয়ানোর বা 'ফোর্সড ফিডিং' ব্যবস্থার অন্তভূর্ক্ত করা হয়৷ রোজ সকালে দশটার দিকে তাগড়া, জোয়ান একদল সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীসহ জেল হাসপাতালের কম্পাউন্ডার বা ডাক্তার একটা বাহিনী নিয়ে এসে চড়াও হত৷ তাদের হাতে থাকত বালতির মধ্যে পানির সঙ্গে দুধের পাউডার মেশানো 'দুধ-পানি'৷ ফোর্সড ফিডিং এর এই বাহিনী প্রত্যেক বন্দির কাছে গিয়ে বন্দিরা যেন বাধা দিতে না পারে সেজন্য তাঁর হাত পা চেপে ধরত ৷ তাঁদের হাত পা চেপে ধরে তাঁদের নাকের মধ্য দিয়ে একটা রবারের নল পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করত৷ এই রবারের নলের উপর দিকে রাখা বাটি বা কুপিতে সেই দুধ মেশানো পানি একসের কি আধসের ঢেলে দিত৷ এভাবেই খাওয়ানো হতো অনশনরতবন্দিদের৷ গোড়া থেকে যারা অনশন করেছিলেন তাঁদের ৫৮ দিন পুরো হওয়ার পরে একটা ফয়সালা হয়৷ আর সরদার ফজলুল করিম ত্রিশ দিন পুরো অনশন করে৷ এর মাধ্যমে কাপড়-চোপড় এবং থাকা খাওয়ার ব্যাপারে কিছু মর্যাদা এবং উন্নত অবস্থার স্বীকৃতি দেয়া হয় তাঁদের৷ ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে দীর্ঘ পাঁচ বছর বন্দী জীবনের পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান৷ এরপর তিনি আরও তিনবার কারাবরণ করেন৷

১৯৫৭ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি সুলতানা রাজিয়াকে বিয়ে করেন তিনি৷ বিয়ের পর সুলতানা রাজিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি নেন৷ এছাড়া তিনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রেষণে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন৷ তাঁদের এক মেয়ে এবং দুই ছেলে৷ বড় মেয়ে আফসান করিম ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন৷ সরদার ফজলুল করিম তখন জেলে৷ আফসান করিম ফার্মাকোলজির চিকিত্‍সক৷ তাঁর স্বামী শাকিল আখতার একজন চিকিত্‍সক৷ বড় ছেলে সরদার মারুফ করিম পৈত্রিক সম্পত্তি দেখাশুনা করেন৷ ছোট ছেলে সরদার মাসুদ করিম একজন স্থপতি৷

মুক্তিযুদ্ধের সময় সরদার ফজলুল করিম পরিবার নিয়ে ঢাকাতেই ছিলেন৷ এইসময় তিনি বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি শাখার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন৷ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি ১০ টা সাড়ে ১০ টার সময় অফিসে পৌঁছেন৷ এর কিছুক্ষণ পর কয়েকজন লোক এসে তাঁকে ধরে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয়৷ জেলে তাঁর উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়৷ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করল৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার খবরটা তিনি জেলে বসেই শুনতে পেলেন৷ ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা এসে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের দরজা খুলে দেয়৷ ঐ দিন অন্য সব কয়েদির সাথে তিনি মুক্তি পান এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বহু স্মৃতি-বিজড়িত গেটটি পার হয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন৷

সরদার ফজলুল করিম ছাত্রাবস্থায়ই প্রগতি লেখক সংঘের কাজে সম্পৃক্ত হন ৷ ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন৷ এছাড়া তিনি অনেক বই রচনা করেছেন৷ তাঁর রচিত ও অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে- প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, এ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, রুশোর সোশ্যাল কনট্রাকট, পাঠপ্রসঙ্গ, চল্লিশের দশকের ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ, সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা, নানা কথা, নানা কথার পরের কথা এবং নূহের কিসমত ইত্যাদি৷ এছাড়া 'দর্শনকোষ' নামে দর্শনের একটি অভিধান লিখেছেন তিনি ৷ বইটি বের করেছে বাংলা একাডেমী৷

সরদার ফজলুল করিম নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন৷ এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-১৯৯৮ সালে সিধু ভাই স্মৃতি সংসদ তাঁকে স্মৃতিপদক প্রদান করে৷ ১৯৯৯ সালের ২১ মার্চ গুণমুগ্ধজন পুরস্কার পান ৷ ১৯৯৯ সালে দৈনিক জনকন্ঠ গুণীজন সম্মাননা দেয়৷ ২০০০ সালের ১৩ মে বরিশাল বিভাগ সমিতি, ঢাকা শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য 'শেরে বাংলা পদক'-এ ভূষিত করে৷ ২০০১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার থেকে শিক্ষাবিদ হিসাবে শিক্ষা পুরস্কার পান৷ ২০০১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ তাঁকে গুণীজন সম্মাননা দেয়৷ ২০০৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা সংস্কৃতি সংসদের পক্ষ থেকে 'দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক' পান৷ অনুবাদের জন্য পান বাংলা একাডেমী পুরস্কার৷

 

. সাক্ষাত্‍কার সরদার ফজলুল করিম, তারিখ :১২.০২.০৭, ২৭.১০.০৭, ২৮.১১.০৭৷

. রুমীর আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ : সরদার ফজলুল করিম; ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯৷

. মধ্যরাতের অশ্বারোহী - ট্রিলজির প্রথম পর্ব :ফয়েজ আহ্ মদ, জুলাই ২০০৩; পৃষ্ঠা ১১৩-১১৫, ১২০-১২২৷

. দৈনিক সমকাল, ১২ আগস্ট ২০০৭৷

. নানা কথার পরের কথা:সরদার ফজলুল করিম, জুন ১৯৮৪৷

. সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা৷

. নূহের কিসমত এবং অন্যান্য প্রবন্ধ :সরদার ফজলুল করিম জুন ১৯৯৩৷

 

মূল লেখক : রীতা ভৌমিক

পুনর্লিখন : গুণীজন দল

(বি:দ্র: গুণীজন থেকে নেয়া)

Comments (0)Add Comment

Write comment

busy

আরও পড়ুন

  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • 8

হিট পরিসংখ্যান

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterআজকের ভিজিটর সংখ্যা35
mod_vvisit_counterগতকালের ভিজিটর সংখ্যা74
mod_vvisit_counterএই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা579
mod_vvisit_counterগত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা1302
mod_vvisit_counterএই মাসের ভিজিটর সংখ্যা1372
mod_vvisit_counterগত মাসের ভিজিটর সংখ্যা4654
mod_vvisit_counterসর্বমোট ভিজিটর29949

We have: 1 guests, 1 bots online
Your IP: 38.107.191.103
 , 
Today: Sep 09, 2010
এখন পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটের হিট25018