লড়াই সংগ্রাম
খাপড়া ওয়ার্ডের দুঃসহ স্মৃতি_সফিউদ্দিন আহমেদ
খাপড়া ওয়ার্ডের দুঃসহ স্মৃতি_সফিউদ্দিন আহমেদ
আজ থেকে ষাট বছর আগের কথা। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের ‘খাপড়া’ ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তখন যতোদূর মনে পড়ে আমিসহ ৩৯ রাজবন্দী ছিল। ঐদিন ঐ ওয়ার্ডের রাজবন্দীদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের নির্দেশ মতো। শুধু গুলি নয়, বন্দিদের ওপর লাঠিচার্জও করা হয়েছিল। আহতদের মধ্যে যারা পানি পানি বলে চিৎকার করেছিলেন, পানির বদলে তাঁদের মুখে প্রস্রাব করে দেয়া হয়েছিল।
সেদিন সর্বমোট ষাট রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হানিফ শেখ, আনোয়ার হোসেন, সুখেন ভট্টাচার্য, দেলোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, কম্পরাম সিং ও বিজন সেনসহ মোট ৮ জন; বাকিরা সবাই আহত হয়েছিলেন। আমার যতোদূর মনে পড়ে আহতদের মধ্যে আমিসহ বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম বাদশা, প্রসাদ রায়, আব্দুস শহিদ, নুরুননবীসহ ৩১ জন ছিলাম রাজবন্দী। সে দিন ছিল সোমবার, সকাল ৯টায় জেল সুপার মি. বিল তার সাপ্তাহিক পরিদর্শনে আসেন। সুপারের সঙ্গে জেলে ডাক্তার, দু’জন ডেপুটি জেলর, হেড ওয়ার্ডাররা ও আরো অনেক জেল কর্মকর্তাসহ জেল সিপাহীরা ছিলেন।
রাজবন্দীরা যেখানে থাকতো সেই খাপড়া ওয়ার্ডের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাজবন্দীদের সঙ্গে তাঁদের সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। তখন রাজবন্দীদের পক্ষে নেতা ছিলেন যশোরের কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল হক। তিনি রাজবন্দীদের পক্ষে বলেছিলেন, আমরা (রাজবন্দীরা) মিষ্টি কুমড়ার ঘেট খেতে পারবো না। জেল সুপার ওহাব জবাবে বলেছিলেন, ‘তোমরা দেশদ্রোহী, ভারতের পঞ্চম বাহিনী ও পাকিস্তানের শত্রু। তোমাদের এর চেয়ে ভালো খাবার দেয়া যাবে না।’ এ নিয়ে তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে মি. বিল তার হাতে থাকা বেত দিয়ে রাজবন্দীদের মারতে উদ্যত হলে এক রাজবন্দী (যাঁর নাম এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না) বেতখানা ধরে ফেলেন। সুপার মি. বিলসহ ধস্তাধস্তি করতে করতে কয়েকজনকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেন। মি. বিল সঙ্গে সঙ্গে পাগলাঘণ্টি (হুইসেল) বাজিয়ে দেন। জেলার মান্নানও হুইসেল বাজান। ঘরের মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
অল্পক্ষণের মধ্যেই মি. বিল রাজবন্দীদের হাত ছাড়িয়ে ঘরের বাইরে চলে আসেন। এক ডাক্তার ও এক ডেপুটি জেলার ঘরের মধ্যে আটকা পড়েন। বাইরে থেকে ঘরটিকে বন্ধ করে দেয়া হয়। জেলারের হুইসেল শুনে সমগ্র জেলে পাগলাঘণ্টি বাজিয়ে দেয়া হয়। তারপর এক লোমহর্ষক কাণ্ড ঘটে যায়। জেল সিপাইরা জানালার ফাঁকফোঁকর দিয়ে ক্রমাগত গুলিবর্ষণ করতে থাকে। রাজবন্দীরা ঘরের ভেতর থেকে নারিকেলের ছোবড়ার গদি, লোহার খাট, চৌকি ইত্যাদি খাড়া করে নিজেদের ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু গুলির আঘাতে সেগুলো ক্রমে ক্রমে এদিক সেদিক ছিটকে পড়ে। কাজেই ঘরের মধ্যে যাঁরা ছিলেন তাঁরা অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন এবং ঘর হতে রক্তের স্রোত বইতে থাকে। তবে আমি প্রস্রাবের একটি ড্রাম উল্টিয়ে তার মধ্যে আশ্রয় নেয়ায় গুলি আমার গায়ে লাগেনি। মি. বিল শুধু জেলের সিপাইদের গুলির নির্দেশ দিয়ে ক্ষান্ত হননি, তিনি বাইরে থেকে পুলিশ সুপারকে দিয়ে রিজার্ভ পুলিশ ঢুকিয়ে মৃত্যুমুখী রাজবন্দীদের ওপর অত্যাচার চালান।
সেই সময়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এই মুহূর্তে যার নাম মনে পড়ছে না) তিনি সম্ভবত মুর্শিদাবাদের বাঙালি মুসলমান ছিলেন। তিনি জেলে প্রবেশ করেই খাপড়া ওয়ার্ডে এসে দেখেন রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। অথচ পুলিশ সুপারকে মি. বিল বলেছিলেন রাজবন্দীরা জেলের দেয়াল ভেঙে পালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ সুপার জেল সুপারের প্রতি রুষ্ট হলেন। আমার যতোদূর মনে পড়ে, তৎকালীন রাজশাহী জেলের প্রশাসক ছিলেন এক অবাঙালি মুসলমান। তার নাম সম্ভবত আব্দুল মজিদ। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান নামের শিশুরাষ্ট্রকে যারা ধ্বংস করতে চায় তাদের প্রতি সঠিক ব্যবহার করা হয়েছে বলেই মন্তব্য করেন। এ অবস্থায় আহত রাজবন্দীদের বিনা চিকিৎসায় রেখে দেয়া হয়। আহতদের ক্ষতস্থানের মাংসে পচন ধরে এবং গ্যাংগ্রিন হয়ে যায় অনেকের। আহত নুরুননবীর পা কেটে ফেলে দেয়া হয়। আমার যতোদূর মনে পড়ে, আহতদের মধ্যে কাউকে কাউকে জেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে অন্যান্য জেলে স্থানান্তর করা হয়। কৃষক নেতা মুনসুর হাবিব (পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন) আমার সঙ্গে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমাকে ঘটনার দু’একদিন পর সিলেট জেলে স্থানান্তর করা হয়।
সিলেট জেলের বাহিনী আবার অন্যরূপ। সিলেট জেলে গিয়ে যাঁদের দেখতে পেয়েছিলাম তাঁরা হলেন কমরেড বরুণ রায় (যিনি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য হয়েছিলেন), নুতন সেন, বিজন বিহারী পুরকায়স্থসহ (বর্তমান গণফোরাম নেতা পংকজ ভট্টাচার্যের শ্বশুর) ৮-১০ রাজবন্দী। তখন সিলেট জেলে মে দিবস পালনের প্রস্তুতি চলছিল। আমি সিলেট জেলে ঢুকেই সকলের পরামর্শে মে দিবসের জন্য লাল পতাকা বানানোর জন্য আমার আঙুলের চামড়া কেটে রক্ত বের করে সাদা কাপড়কে লাল পতাকা বানিয়েছিলাম এবং মে দিবসে ওই পতাকার নিচে রাজবন্দীদের দাঁড় করিয়ে স্লোগান দিলাম ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।
যদিও ঐ মে দিবসকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার স্বীকৃতি দেয়নি। তাই জেলের ভেতরে সরকারের অনুমতি না নিয়ে মে দিবস পালন করায় অপরাধ হয়েছিল বিধায় আমাকে ফাঁসির সেলে রাখার জন্য দেড় মাসের শাস্তি দেয়া হয়েছিল। উক্ত ফাঁসির সেলে দীর্ঘ এক মাস অবস্থানের পর আমার রক্তে শতকরা ৭৫% ইসনোফিন (রক্তে সাধারণত যা ৫ ভাগ থাকে) হয়ে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে তৎকালীন সিলেট জেলের সিভিল সার্জন সরকারের কাছে সুপারিশ করেছিলেন, ‘হয় তাঁকে মুক্তি দেয়া হোক, নয়তো সে জেলেই মারা যাবে।’
এ অবস্থার প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার আমাকে আমার গ্রামের বাড়িতে (তৎকালীন মুন্সীগঞ্জ মহকুমার লৌহজং থানার হাড়িদিয়া গ্রামে) নজরবন্দী (হোম ইন্টার্ন) করে দেয়া হয়। মাসাধিককাল গ্রামে থাকার পর আমার স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি না হওয়ায় আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা শহরে স্থানান্তর করা হয়। ওই সময় আমি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই; পরবর্তী সময়ে জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই এবং ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিই। এর আগে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে রেসকোর্স ময়দানে কালো পতাকা দেখাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হই। ঐ সময় আমি হরগঙ্গা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম।
আজ থেকে ৬০ বছর আগে খাপড়া ওয়ার্ডের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কোনো সরকারই জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু খাপড়া ওয়ার্ডের আহত-নিহত রাজবন্দীরা কি মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রজ নয়?

আরও পড়ুন
-
বিপ্লবী কল্পনা দত্ত “বাংলায় বীর যুবকের অভাব নেই। বালেশ্বর থেকে জালালাবাদ, কালারপোল পর্যন্ত এদের...
-
সত্যেন সেন : মেহনতি মানুষের এক পরম সুহৃদ_গোলাম মোহাম্মদ ইদু ২৮ মার্চ, সত্যেন সেনের জন্মশতবার্ষিকী। প্রয়াত সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ...
-
সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: এম এ আজিজ মিয়া বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য...
-
কমরেড সরোজ দত্ত: বাসু আচার্য্য ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২১’শে ফাল্গুন সরোজ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাঙলার...
-
পূর্ণেন্দু দস্তিদার: অগ্নিযুগের বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার। অগ্নিযুগের বিপ্লবী। সশস্ত্র বিপ্লবী। কিংবদন্তি বিপ্লবী...
- 1
- 2
- 3
- 4
- 5
- 6
- 7
- 8
হিট পরিসংখ্যান






![]() | আজকের ভিজিটর সংখ্যা | 34 |
![]() | গতকালের ভিজিটর সংখ্যা | 74 |
![]() | এই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা | 578 |
![]() | গত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা | 1302 |
![]() | এই মাসের ভিজিটর সংখ্যা | 1371 |
![]() | গত মাসের ভিজিটর সংখ্যা | 4654 |
![]() | সর্বমোট ভিজিটর | 29948 |
Your IP: 38.107.191.103
,
Today: Sep 09, 2010






