মোহাম্মদ সুলতান: একজন ভাষা সৈনিক

মোহাম্মদ সুলতান একজন ভাষা সৈনিকরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে জীবন জীবনবাজী রেখে লড়াই করেছেনমাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে পৃথিবীতে যে সকল আন্দোলন এ যাবতকালে সংগঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বাঙ্গালীর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন শ্রেষ্টতমযার কারণে ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়

ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের জন্ম ১৯২৬ সালের ২৪ ডিসেম্বরপঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার অন্তর্গত মাঝ গ্রামেতাঁর বাবা মোহাম্মদ শমসের আলীতিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের পুলিশ বিভাগের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশসুলতান ছিলেন ৮সন্তানের মধ্যে পঞ্চম

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেপ্রাথমিক পড়াশুনা শেষে মোহাম্মদ সুলতান যশোর জেলা স্কুলে ভর্তি হনএই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হনতারপর ১৯৪৬ সালে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী সরকারি কলেজেএসময় তিনি ছাত্র ফেডারেশনে সক্রিয় কর্মী হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেনএই কলেজ থেকে আই এ পাস করার পর স্নাতকে এখানেই পড়াশুনা করেনরাজশাহী সরকারি কলেজে  থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেনএরপর ১৯৫১ সালে তিনি এম এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন১৯৫৩ এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন

ছাত্র জীবনেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থেকে সক্ষম নেতৃত্বদানের যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন১৯৪৮ সালে রাজশাহী ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন১৯৫১ সালে যুবলীগে যোগ দিলে তিনি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হনমোহাম্মদ সুলতান ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠকতিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলনকারী শিক্ষার্থী

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা ছিল উত্তালএ আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে এবং রাজপথের সবখানে৫২সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবসওই দিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকেসকাল ১১ টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়

২০ ফেব্রুয়ারী পাকিস্থান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংযের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে

২১ ফেব্রুয়ারি সকালের দিকে ১৪৪ ধারা ভংগের ব্যাপারে ছাত্র-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. এস এম হোসেইন এর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক সমাবেশ স্থলে যান এবং ১৪৪ ধারা ভংগ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন

বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভংগের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হনএ অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১১৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিলসংগ্রাম পরিষদের সভায় আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও গোলাম মওলা ১১৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে ভোট দেনছাত্ররা ১০ জনে অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে ১১৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয়অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কন্ঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবীতে আন্দোলোন তীব্র হয়ে উঠেপুলিশের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ হয়শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসবুলেট আর লড়াই শুরু হয়পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করেগুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দীন, এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মারা যায়রফিক, জাব্বার, বরকত সহ নাম না জানা আরও অনেকের সাথে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে জন্ম নেয় পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নতিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম১৯৫৩ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হনএসময় তিনি একই সাথে যুবলীগের যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন১৯৫৩ সালে মার্চ মাসে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করেন মোহাম্মদ সুলতানপ্রকাশনার কিছুদিনের মধ্যে তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার একুশে ফ্রেবুয়ারি বইটি বাজেয়াপ্ত করে১৯৫৪ সালে ৯২(ক) ধারা প্রবর্তনের সাথে সাথে সুলতানকে গ্রেফতার করা হয়এসময় তাকে বিনাবিচারে প্রায় এক বছর কারাগারে থাকতে হয়

১৯৫৬ সালে যুবলীগ সম্পাদক ইমাদুল্লাহ মারা যানএ সময় মোহাম্মদ সুলতানকে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়১৯৫৭ সালে ন্যাপের জন্মলগ্নেই ন্যাপ প্রাদেশিক কমিটির যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেন তিনি১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে মোহাম্মদ সুলতান আবারও গ্রেফতার হনএসময় তিনি বিনাবিচারে চার বছর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্তির পর তিনি মাওলানা ভাসানীর অংশের প্রাদেশিক কমিটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে তা যথাযথভাবে পালন করেনপাকিস্তান সরকার বিভিন্ন সময়ে তাঁর নামে হুলিয়া জারি করেফলে তাঁকে  আত্নগোপন গিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যহত রাখেন

তিনি ১৯৭০ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে প্রকাশনার কাজে যুক্ত হনতিনি প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এম আর আখতার মুকুলের সাথে পুস্তক প্রকাশনা এবং বিক্রয়কেন্দ্র পুঁথিঘর প্রতিষ্ঠা করেনতিনি প্রগতিশীল পুস্তক প্রকাশনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তাঁর শেষ সম্বলটুকু দিয়ে প্রগতিশীল পুস্তক প্রকাশনার চেষ্টা অব্যহত রাখেনপুস্তক প্রকাশকদের সংগঠিত করে দেশে সৃজনশীল ও প্রগতিশীল সাহিত্য পুস্তক প্রকাশনার জন্য এক গঠনমূলক আন্দোলন গড়ে তোলেনমোহাম্মদ সুলতান বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক সমিতির সহ-সভাপতি এবং বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্য ছিলেন

১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি মারা যান২০০৭ সালে মোহাম্মদ সুলতানের স্মরণে ঢাকা শহরের  ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কটি ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক হিসেবে নামকরণ করা হয়

 

Comments (0)Add Comment

Write comment

busy

আরও পড়ুন

  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • 8

হিট পরিসংখ্যান

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterআজকের ভিজিটর সংখ্যা71
mod_vvisit_counterগতকালের ভিজিটর সংখ্যা272
mod_vvisit_counterএই সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা71
mod_vvisit_counterগত সপ্তাহের ভিজিটর সংখ্যা1302
mod_vvisit_counterএই মাসের ভিজিটর সংখ্যা864
mod_vvisit_counterগত মাসের ভিজিটর সংখ্যা4654
mod_vvisit_counterসর্বমোট ভিজিটর29441

We have: 2 guests, 1 bots online
Your IP: 38.107.191.102
 , 
Today: Sep 05, 2010
এখন পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটের হিট24623